বিমানবন্দরে হামলা হলো, সৌদির সতর্কতা ব্যবস্থা কেন নীরব ছিল

১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার পর আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ফাইল ছবি / রয়টার্স
সৌদি আরবে বড় ধরনের সামরিক হামলার আশঙ্কায় জনসাধারণকে সতর্ক করার ব্যবস্থা কয়েক দিন ধরে বন্ধ ছিল। এর মধ্যেই রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে। গত শুক্র থেকে রবিবার বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে চারটি হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
হামলার আগে কেন জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়নি, সে বিষয়ে সৌদি সরকার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
ইয়েমেনে ইরানপন্থী হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরব নিজেদের দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছে। হামলার আগাম সতর্কতা দিলে দেশে সহিংসতার মাত্রা ও নিরাপত্তাঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত। তাই সতর্কতা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে চারজন পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তা এবং কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, বিমানবন্দরে হামলার সময় সতর্কতা না থাকায় সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দেশটির বাসিন্দা ও বিদেশি দর্শনার্থীদের সুরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।
তাদের মতে, একই সঙ্গে দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় আছে এমন দেখানোর চেষ্টাও এর পেছনে কাজ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সৌদি শিক্ষাবিদ ও মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ আবাসিক ফেলো সুলতান আলামের বলেছেন, ‘তারা সামরিক অভিযান চালাতে চায়, আবার একই সময়ে জনগণ ও বাইরের অংশীদারদেরও আস্থা দিতে চায়। তারা দুটোই একসঙ্গে করতে চাইছে।’
সৌদির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ আগাম সতর্কতা জারি করে। সংস্থাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কেন হামলার আগে সতর্কতা জারি করা হয়নি, এ বিষয়ে রয়টার্স ই-মেইলে জানতে চাইলেও সংস্থাটি এবং সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর কোনো জবাব দেয়নি।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সতর্কতা বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিতে পারে। কারণ, হামলার আগে কোনো সতর্কতা না থাকায় সৌদি আরবে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সোমবার সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ আবার সতর্কতা জারি করেছে। ২৯ সেপ্টেম্বরের পর এটিই ছিল প্রথম সতর্কতা। রিয়াদ ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় এসব সতর্কতা জারি করা হয়।
তবে বিমানবন্দরে হামলার কারণেই আবার সতর্কতা চালু করা হয়েছে কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি। এ বিষয়ে সৌদি সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সতর্কতা ব্যবস্থা কেন নীরব ছিল
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় সব দেশই ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। তবে এসব হামলার আগে জনসাধারণকে সতর্ক করার পদ্ধতি দেশভেদে ভিন্ন।
কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতিটি হামলার আগে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। জুলাইয়ে হওয়া হামলাগুলোর সময়ও বাসিন্দাদের ঘরে থাকতে এবং জানালা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
বাহরাইন ও কুয়েত একাধিকবার সাইরেন বাজিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
সৌদি আরব মে মাসে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানোর জন্য জাতীয় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করেছিল। কিন্তু হুতিদের হামলা বাড়তে থাকার পরও গত সপ্তাহ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা নীরব ছিল।
সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের এক্স অ্যাকাউন্টের পোস্ট অনুযায়ী, সর্বশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। ওই সতর্কতা ছিল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের জন্য।
তবে আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা দেওয়া বন্ধ হয়নি। বৃষ্টি ও বন্যার মতো পরিস্থিতিতে মানুষকে নিরাপদ থাকতে নিয়মিত সতর্ক করা হয়েছে। সোমবারও এমন সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
সরকারের মার্চে জারি করা নিয়ম অনুযায়ী, হামলা প্রতিহত করার ঘটনা ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের স্থান নিয়ে ছবি, গুজব বা তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়ার জন্যও বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে।
এ ধরনের তথ্য ছড়ানোর কারণে কেউ বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি। এ বিষয়ে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তরও কোনো মন্তব্য করেনি।
হামলার আগে সৌদি আরবের এক মিত্র পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তারা দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন আগাম সতর্কতা বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি সরাসরি জানা দুই কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, এসব সতর্কতা খুব বেশি বিঘ্ন তৈরি করছিল। রাতে সতর্কবার্তার শব্দে অনেক মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠছিলেন এবং এ নিয়ে অভিযোগও ছিল।
তবে এ বক্তব্যের বিষয়ে সৌদি সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেছেন, হামলা নিয়ে জনগণকে তথ্য দেওয়া এবং দেশের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন না ঘটানোর মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে রিয়াদ। কিন্তু এর ফলে হামলা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘হুতিদের মোকাবিলা করতে তাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু তারা চায় না, এর ফলে দেশের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হোক। জনসাধারণকে দেওয়া বার্তাতেও সেই দ্বিধা দেখা যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘কিন্তু হুতিদের আসন্ন হামলার বিষয়ে সতর্কতা না দিলে যে উদ্বেগ তৈরি হবে, তারা সেটিই এড়াতে চাইছে।’
নতুন করে হামলার সতর্কতা
সরকারের ঘনিষ্ঠ সৌদি বিশ্লেষক আলী শিহাবি বলেছেন, আগাম সতর্কতা দেওয়া হোক বা না হোক, দেশের বিশাল আয়তনের কারণে সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা একসঙ্গে রক্ষা করা সৌদি আরবের জন্য কঠিন।
তিনি বলেছেন, ‘সৌদি আরবে সুরক্ষার জন্য অনেক বেশি স্থাপনা রয়েছে। দেশটি বিশাল। এখানে বিমানবন্দর, পাইপলাইন ও তেল স্থাপনা রয়েছে। একই সময়ে সবকিছু রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারিও নেই।’
তার ভাষায়, ‘সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার প্রয়োজন সীমাহীন।’
হামলার পরও সোমবার সৌদি আরব একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে। তবে রিয়াদে হামলার পর বড় কয়েকটি তেল কোম্পানির প্রধান ওই সম্মেলনে অংশ নেওয়া বাতিল করেছেন।
রিয়াদে বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের জ্বালানি সম্মেলনে সৌদি যুবরাজের ভাই এবং দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমান দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ঝুঁকির কথাও স্বীকার করেছেন। সৌদি আরব তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দৃঢ় বলেও জানিয়েছেন তিনি।
রিয়াদে আসা অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আপনারা জানেন, এই দেশ নিরাপদ।’
তবে তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, ‘আমাদের এখানে একত্র হওয়া মানে এই নয় যে ঝুঁকি চলে গেছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা আমাদের অঙ্গীকার ও লক্ষ্য ধরে রাখার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করব না।’
দূতাবাসগুলো নিজেদের সতর্কতা জারি করছে
চলতি মাসে সোমবারের আগ পর্যন্ত সৌদি সরকার জনসাধারণের জন্য কোনো আগাম সতর্কতা জারি না করলেও রিয়াদে প্রায় এক ডজন হামলা হয়েছে বলে দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এই সময়ে সৌদিতে থাকা পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলো নিজেদের কর্মীদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে আলাদা সতর্কতা জারি করেছে। বিষয়টি জানা তিন ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন। রয়টার্স এসব সতর্কবার্তাও দেখেছে।
গত সপ্তাহের হামলাগুলোর মধ্যে শনিবারের হামলাই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। এর আগে কেন কোনো সতর্কতা দেওয়া হয়নি, তা রয়টার্সও নিশ্চিত হতে পারেনি।
রবিবার সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শনিবারের হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে বিমানবন্দরের টার্মিনালে থাকা যাত্রীদের দেখা যায়। অনেকে বিমানে ওঠার জন্য সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নারী-পুরুষরা চেয়ারে বসে মোবাইল ফোনের পর্দায় তাকিয়ে ছিলেন।
এরপরই ভিডিওতে ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের উজ্জ্বল কমলা আভা দেখা যায়।
একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভ্যন্তরীণ সতর্কতা তৈরি করা হয় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারি গোয়েন্দা তথ্য এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।
গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে প্রথম দুটি হামলার সময়ও দূতাবাসগুলোর কর্মীদের সতর্ক করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
তবে শনিবারের বিমানবন্দর হামলার আগে দূতাবাসগুলোর কাছেও কোনো অভ্যন্তরীণ সতর্কতা পৌঁছায়নি। কেন এমন হয়েছিল, সে বিষয়ে তারা কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।







