অসহায়দের পরমবন্ধু রায়হান

দরিদ্রদের স্বাবলম্বী করতে গরু উপহার রায়হানের
করোনাকালে তার ‘ত্রাণ নয়, সম্মানের সাথে কিনে নিন’ স্লোগানে কম মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির উদ্যোগ ব্যাপক আলোচিত বিষয় ছিল। তখন বেওয়ারিশ কুকুরদের খাবার বিতরণ কার্যক্রমও সবার নজর কাড়ে।
মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় সুবিধাবঞ্চিত বন্ধুদের হাতে খাতা-কলম তুলে দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা শুরু মাহমুদ হাসান রায়হানের। আজ তা রূপ নিয়েছে এক বিশাল মানবিক প্রয়াসের।
রায়হান পটুয়াখালী শহরের শহীদ আলাউদ্দিন শিশু পার্ক এলাকার বাসিন্দা। যার কাছে মানবসেবা কোনো শখ নয়, জীবনের মূল ব্রত। পটুয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই তরুণ শৈশব থেকেই নিজের ভেতরের প্রবল মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে জড়িয়ে পড়েন স্বেচ্ছাসেবী কাজে।
দীর্ঘদিন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রায়হান প্রতিষ্ঠা করেন ‘পটুয়াখালীবাসী’ নামের একটি সংগঠন। বর্তমানে তার সঙ্গে ৩০ জনের একদল উদ্যমী ও তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
রায়হানের উল্লেখযোগ্য মানবিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে— দুই হাজারেরও বেশি দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, বজ্রপাত ও পরিবেশ রক্ষায় তালবীজ এবং বৃক্ষরোপণ। কুড়িগ্রাম, ফেনী, উত্তরবঙ্গের বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়— ফণী, বুলবুল, আম্পানের সময় দুর্গতদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রদান। দরিদ্র পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে বাছুর গরু, ভ্যানগাড়ি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন উপহার। অসহায় রোগীদের চিকিৎসার অর্থ জোগাড়, প্রতিবন্ধীদের হুইলচেয়ার প্রদান, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং ডেঙ্গু সচেতনতা তৈরি।
এক সন্তানের জনক রায়হানের এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিবার। পরিবারের সার্বিক অনুপ্রেরণাতেই তিনি আজ নিজ এলাকার গণ্ডি পেরিয়ে কুড়িগ্রাম, ফেনী, দিনাজপুরের মানুষের কাছেও ‘হৃদয়বান স্বেচ্ছাসেবক’ হিসেবে এক নামে পরিচিতি পেয়েছেন।
রায়হান বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই পরিবার আমাকে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে এবং তাদের সহযোগিতার কারণেই আমি এতদূর পর্যন্ত আসতে পেরেছি। পরিবারের সদস্যরাও আমাকে নিয়ে গর্ব করেন এবং বিভিন্নভাবে আমাকে অনুপ্রাণিত করেন।
রায়হানের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও আত্মতৃপ্তির কাজ হলো, পরিচয়হীন ও বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা। যেসব লাশের পরিবারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না, অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পটুয়াখালী মুসলিম কবরস্থানে সেগুলোর জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করেন তিনি।
রায়হান বললেন, ‘সচ্ছল ও বিত্তবান মানুষরা সবসময় সৎ উদ্দেশ্যে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে চান। আমি শুধু সেই সেতুবন্ধটুকু তৈরি করার চেষ্টা করি। সমাজকে কতটা দিতে পেরেছি জানি না, তবে বহু তরুণকে মানবিক কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন, প্রতিটি ঘরে যেন অন্তত একজন করে এমন স্বেচ্ছাসেবক তৈরি হয়, যারা নিঃস্বার্থভাবে সমাজের কল্যাণে কাজ করবে।’



