যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শেয়ারে বড় পতন, ধাক্কা এশিয়া-ইউরোপের বাজারে
দ্য গার্ডিয়ান
শেয়ার করুন:
সংগৃহীত ছবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের সুফল নিয়ে উদ্বেগের জেরে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বৃহস্পতিবারের ধসের প্রভাব পড়েছে এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে। শুক্রবার এসব অঞ্চলের প্রধান শেয়ারসূচকগুলোতে বড় পতন দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সামনে শেয়ার বিক্রির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রি বেড়ে যায়। পরেরদিন এর প্রভাব পড়ে এশিয়ার বাজারে। পরে সেই ধাক্কা লাগে ইউরোপের শেয়ারবাজারেও। একপর্যায়ে লন্ডনের শেয়ারবাজার চলতি বছরের মার্চের পর সবচেয়ে খারাপ দিনের মুখে পড়ে।
লন্ডনের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর নিয়ে গঠিত এফটিএসই ১০০ সূচক শুক্রবার সকালে একপর্যায়ে ২৫৪ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমে ১০ হাজার ৫২৮ পয়েন্টে নেমে আসে। তবে দিনের শেষ দিকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে সূচকটি ১ শতাংশ পতন নিয়ে লেনদেন শেষ করে। ওয়াল স্ট্রিটে লেনদেন শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে সূচক বাড়তে থাকায় লন্ডনের বাজারেও কিছুটা স্বস্তি ফেরে।
ইউরোপের অন্য প্রধান বাজারগুলোতেও দরপতন হয়েছে। জার্মানির ড্যাক্স সূচক কমেছে ২ শতাংশ। ফ্রান্সের ক্যাক ৪০ সূচক কমেছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ এবং স্পেনের আইবেক্স সূচক শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে দরপতনের তীব্রতা বেড়েছে। ওয়াল স্ট্রিটে বড় ধরনের দরপতনের প্রভাব সরাসরি এশিয়ার বাজারে পড়েছে। এতে ইউরোপের বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে।
সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, ‘বড় কয়েকটি উদ্বেগ একসঙ্গে সামনে এসেছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি কমে যেতে পারে। এতে এআই খাতের উত্থানের পেছনে থাকা বিপুল বিনিয়োগ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে এই বিশাল বিনিয়োগ থেকে কতটা মুনাফা আসবে, তা নিয়েও বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন।’
তবে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস পাওয়া গেছে। প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের দর বাড়ায় এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক বেড়েছে ১ শতাংশ। যদিও আগের দিনের বড় পতনের তুলনায় এই উত্থান ছিল সামান্য।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো কর্মসংস্থান প্রতিবেদনও বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরে দেশটিতে নতুন করে ১ লাখ ৬৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এতে বেকারত্বের হার কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। গত ১৯ মাসের মধ্যে এটিই ছিল সূচকটির সবচেয়ে বড় এক দিনের পতন।
ওই দিন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চিপ ও প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার। মেমোরি চিপ নির্মাতা স্যানডিস্কের শেয়ারের দর কমেছে ২২ শতাংশ। আর হার্ডড্রাইভ নির্মাতা ওয়েস্টার্ন ডিজিটালের শেয়ারের দর কমেছে ১৭ শতাংশ।
এদিকে ওয়াল স্ট্রিটের আতঙ্ক সূচক হিসেবে পরিচিত ভিআইএক্স ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম কয়েক সপ্তাহের পর সূচকটি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই উত্থান বাজারে অস্থিরতা ও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শুক্রবার এশিয়ার শেয়ারবাজারেও দরপতন অব্যাহত ছিল। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক কমেছে ৬ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি।
বিনিয়োগ ও লেনদেন প্রতিষ্ঠান সিএমসি মার্কেটসের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের প্রধান ক্রিস্টোফার ফোর্বস বলেন, ‘পরিস্থিতি আসলেই বেশ বিপর্যয়কর। আমাদের অনেক গ্রাহক বিভিন্ন সূচক ও শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন। তাদের অনেকেই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সারা রাত ও দিনজুড়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে মার্জিন কল ও অভিযোগ এসেছে। কারণ, বিনিয়োগের বিষয়টি আবেগের সঙ্গেও জড়িত। মানুষ কোনো শেয়ার বা বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্দিষ্ট ধারণা পোষণ করেন। পরে যখন তাদের জানাতে হয় যে তারা অর্থ হারিয়েছেন, তখন পরিস্থিতি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে।’
বিনিয়োগ ও লেনদেন প্ল্যাটফর্ম আইজির প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প বলেন, বৃহস্পতিবারের দরপতন আগের দিনের পরিস্থিতির তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন। তবে এআই নিয়ে উদ্বেগ এখনো প্রবল। ফলে শেয়ার বিক্রির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিনিয়োগকারীরা ইরান সংঘাত আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কার দিকেও নজর রাখছেন বলে জানান ক্রিস বিউচ্যাম্প। সপ্তাহের শুরুতে তেলের দাম কমার পর এখন তেলের বাজারের গতিবিধিও সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা। সব মিলিয়ে বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
তবে সাম্প্রতিক দরপতন সত্ত্বেও বছরের শুরু থেকে অধিকাংশ শেয়ারসূচক এখনো ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত নাসডাক কম্পোজিট সূচক বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। যদিও সূচকটি সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ১০ শতাংশের বেশি নিচে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত এফটিএসই ১০০ সূচক বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। তবে জুলাইয়ে গড়া রেকর্ড অবস্থান থেকে সূচকটি এখন ৩০০ পয়েন্টের বেশি নিচে রয়েছে।
বিনিয়োগ ব্যাংক জেফারিজের অর্থনীতিবিদ মোহিত কুমার মনে করেন, বৃহস্পতিবারের দরপতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তবে তার মতে, এই পতন এআই খাতে বিনিয়োগের প্রবণতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সূচনা নয়।
মোহিত কুমার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি এআই খাতে বিনিয়োগ। ডেমোক্র্যাটরা এই প্রবৃদ্ধির উৎস থেকে সরে আসবে বলে আমরা মনে করি না। ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে। এসব কর্মসংস্থান অন্য অঙ্গরাজ্যে বা দেশের বাইরে চলে যাক, তা ডেমোক্র্যাটরা চাইবে না।’
শেয়ারবাজারের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জেও। তামার দাম কমে চলতি বছরের মার্চের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতনের মুখে পড়েছে।
সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস ও গাড়িশিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ধাতু তামার বেঞ্চমার্ক তিন মাস মেয়াদি দাম কমেছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। এতে চলতি সপ্তাহে ধাতুটির দাম মোট ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ কমার পথে রয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিআরইউর প্রধান বিশ্লেষক ক্রেইগ ল্যাং বলেন, তামার দাম ক্রমেই এআই বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব তামার দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।