যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবি লেবার পার্টির, চাপে স্টারমার

কিয়ের স্টারমার
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের দল লেবার পার্টি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এই ফল স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ইংল্যান্ডের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের পুরোনো শিল্প এলাকার লেবার ঘাঁটি এবং লন্ডনের কিছু অংশে কমেছে দলটির সমর্থন। সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে নাইজেল ফারাজের ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে। ইংল্যান্ডে বড় সাফল্যের পাশাপাশি স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসেও অগ্রগতি আশা করছে দলটি।
ব্রিটেনের অন্যতম প্রভাবশালী নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জন কার্টিস বলেছেন, ‘লেবারের জন্য চিত্রটি যতটা খারাপ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল, অবস্থা ততটাই কিংবা তার চেয়েও বেশি খারাপ।’
ইংল্যান্ডের ১৩৬টি স্থানীয় কাউন্সিলের পাশাপাশি স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের বিকেন্দ্রীকৃত পার্লামেন্টে ভোট হচ্ছে। ২০২৯ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের আগে এটি জনমতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইংল্যান্ডে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কাউন্সিল আসন ধরে রাখার লড়াই করছে লেবার পার্টি। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, দলটি কয়েকটি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রিফর্ম ইউকে পেয়েছে ৩৮০টির বেশি আসন। প্রাথমিক গণনায় লেবার হারিয়েছে ২৪৭টি আসন, কনজারভেটিভরা হারিয়েছে ১২৭টি। স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসসহ বেশির ভাগ ফল শুক্রবারের পরে প্রকাশ হওয়ার কথা।
উইগান, বোল্টন, সালফোর্ড ও হ্যালটনের মতো লেবারের পুরোনো ঘাঁটিতে বড় অগ্রগতি পেয়েছে রিফর্ম। হার্টলপুল, টেমসাইড, রেডিচ ও ট্যামওয়ার্থে রিফর্মের উত্থানের মুখে কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে লেবার। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের টেমসাইডে প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবার নিয়ন্ত্রণ হারালো লেবার। সেখানে তারা যে ১৪টি আসন ধরে রাখার চেষ্টা করছিল, সব কটিই জিতে নেয় রিফর্ম।
লেবার পার্টি ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখা সাবেক খনিশ্রমিক অধ্যুষিত উইগানেও নিজেদের কব্জায় থাকা ২০টি আসনের সব কটিতেই রিফর্মের কাছে হেরেছে। সালফোর্ডে ১৬টির মধ্যে মাত্র ৩টি আসন ধরে রাখতে পেরেছে দলটি।
সালফোর্ডের লেবার এমপি রেবেকা লং-বেইলি ফলাফলকে “মন ভেঙে দেওয়ার মতো” বলে বর্ণনা করেছেন।
নাইজেল ফারাজ বলেছেন, এই ফল ব্রিটিশ রাজনীতিতে ‘সত্যিকারের ঐতিহাসিক পরিবর্তন’ নিয়ে এসেছে এবং জনগণের মন থেকে লেবার পার্টি ‘মুছে যাচ্ছে’। তাঁর দাবি, রিফর্ম ভালো ফল করলে স্টারমার ‘গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই বিদায়’ নেবেন।
কনজারভেটিভরাও আসন হারিয়েছে। তবে কিছু জায়গায় সাফল্য পেয়েছে তারা। ওয়েস্টমিনস্টার কাউন্সিল লেবারের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করেছে দলটি। ওয়ান্ডসওয়ার্থেও লেবারের কাছ থেকে আসন জিতে তারা আবার সবচেয়ে বড় দল হয়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের দিনটি ছিল মিশ্র। তারা স্টকপোর্ট ও পোর্টসমাউথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তবে রিফর্মের অগ্রগতির কারণে হাল হারিয়েছে। গ্রিন পার্টি সালফোর্ড, অক্সফোর্ড, সাউদাম্পটন ও এক্সেটারে আসন পেয়েছে এবং লন্ডনের হ্যাকনি ও লুইশামের মতো এলাকায় এগিয়ে রয়েছে।
জরিপ সংস্থা মোর ইন কমনের লুক ট্রাইল বলেন, এই নির্বাচন দীর্ঘদিনের লেবার-কনজারভেটিভ আধিপত্যভিত্তিক ‘প্রচলিত দুই দলের ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভাঙন’ ঘটাতে পারে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক টনি ট্রাভার্স বলেন, লেবার এখন ‘ইংল্যান্ডে চার ফ্রন্টে, আর ওয়েলস ও স্কটল্যান্ড মিলিয়ে পাঁচ ফ্রন্টে’ লড়ছে।
শুক্রবার লেবারের বড় ধাক্কার কথা স্বীকার করেন স্টারমার। তিনি বলেছেন, ফলাফল ‘খুবই কঠিন’ এবং এর দায় তিনি নিচ্ছেন।
পশ্চিম লন্ডনের ইলিংয়ের কিংসডাউন মেথডিস্ট চার্চে স্টারমার বলেছেন, ‘এটা ঢেকে রাখার কিছু নেই। আমরা সারা দেশে অসাধারণ লেবার প্রতিনিধিদের হারিয়েছি। তাঁরা নিজেদের কমিউনিটি ও আমাদের দলের জন্য অনেক কিছু দিয়েছেন। এটি কষ্টদায়ক, আর কষ্টদায়ক হওয়াই উচিত। আমি দায় নিচ্ছি।’ ‘ভোটাররা যখন এমন বার্তা দেন, তখন আমাদের ভাবতে হবে এবং সাড়া দিতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
তবে পদ ছাড়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি স্টারমার। বরং তিনি বলেছেন, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনেও তিনি লেবারকে নেতৃত্ব দিতে চান।
তার ভাষায়, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমরা ভূমিধস জয় পেয়েছিলাম। আমি দলকে সেই জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। এটি দেশ বদলানোর পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট। হ্যাঁ, পরিস্থিতি কঠিন। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও খুব কঠিন। তবে আমাদের আশা জাগাতে হবে এবং মানুষকে বোঝাতে হবে যে পরিস্থিতি ভালো হতে পারে এবং হবে।’
পরবর্তী নির্বাচনে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে লড়বেন কি না-সরাসরি এমন প্রশ্নে স্টারমার বলেন, ‘হ্যাঁ। আমাকে পাঁচ বছরের মেয়াদের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। আমি সেটি শেষ করতে চাই।’ স্টারমারের মিত্ররাও সমর্থন দিয়েছেন তাকে।




