ঢাবি এলাকায় তিন শিক্ষার্থীকে মারধর-ছিনতাইয়ের অভিযোগ

ঢাবির শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। ছবি: আগামীর সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায় ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন সাবেক শিক্ষার্থীকে মারধর, মোটরসাইকেল আটকে রাখা, ছিনতাই এবং অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী আব্দুর রহিম সাজিদ।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১৬ জুলাই রাত সাড়ে ১০টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর, মল চত্বর ও শাহবাগ এলাকায় ঘটে এসব ঘটনা। ভুক্তভোগীদের দাবি, নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পরও তাদের ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে দুই দফায় করা হয় শারীরিক নির্যাতন। একপর্যায়ে আব্দুর রহিম সাজিদকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে দৌড়ে শাহবাগ থানায় আশ্রয় নেন তিনি। তাদের আরও দাবি, এর আগে গত ১৪ মে একই ব্যক্তিদের কাছ থেকে ছিনতাই করা হয়েছিল টাকাও।
আব্দুর রহিম সাজিদ জানান, বন্ধুর ডাকে ঘটনাস্থলে গেলে ১৫ থেকে ২০ জন তাকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পরে ভিসি চত্বর থেকে মধুর ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনের একটি অন্ধকার স্থানে নিয়ে গিয়ে তাকে থাপ্পড়, ঘুষি, লাথি ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। এরপর তাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাটের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে উদ্যানের গেটের কাছে পৌঁছে দৌড়ে শাহবাগ থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে আশ্রয় নেন বলে দাবি করেন তিনি।
রহিম আরও জানান, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের এক সিনিয়রকে ফোন করলে থানায় আসেন তিনি। পুলিশের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হয়। এরপর ভিসি চত্বর থেকে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান তিনি।
অন্য দুই ভুক্তভোগী হলেন ফারদিন খান ও মোর্শেদ আহমেদ। তাদের মধ্যে মোর্শেদ বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগীদের দাবি, আহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে আঘাতের চিহ্ন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন তারা। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযুক্তদের কেউ কেউ ছাত্রদলের বিভিন্ন নেতার অনুসারী এবং সংগঠনের কর্মসূচিতেও সক্রিয়।
অভিযুক্তদের পরিচয়
অভিযোগপত্রে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের বিজয় একাত্তর হলের ইংলিশ ফর স্পিকার্স অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজ (ইএসওএল) বিভাগের আল শামস, জিয়াউর রহমান হলের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের সাদমান সাকিব, সূর্যসেন হলের মাশরুর কামাল মাহি ও শিব্বির আহমেদ, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অভি রহমান, একই হলের সাইফুর রসুল পলাশ, ফারসি ভাষা বিভাগের তামজিদ এবং মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের হীরা রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযোগে নাম থাকা একাধিক শিক্ষার্থী।
থানায় অভিযোগ দায়ের
ঘটনার পরদিন শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন আব্দুর রহিম সাজিদ। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে মারধর, ছিনতাই, অপহরণের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকির বিষয়টি।
শাহবাগ থানার ডিউটি অফিসার তৌকির আহাম্মেদ জানান, দৌড়ে থানায় আশ্রয় নিয়েছিলেন এক যুবক। পরে উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা করে চলে যায়।
লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান। জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হবে পরবর্তী ব্যবস্থা।
যা বলছেন অভিযুক্তরা
অভিযোগের বিষয়ে আল শামস বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোই সঠিক নয়। ছিনতাই, টাকা নেওয়া বা জোর করে কোথাও নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। রহিম আগে আমাদের কয়েকজনের গায়ে হাত তুলেছিল। পরে বিষয়টি মীমাংসাও হয়েছিল। কিন্তু মীমাংসার পরও তার পক্ষ হয়ে ছাত্রশক্তির লোকজন এসে আমাদের হুমকি দেয় এবং ভিসির কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। এরপর বিষয়টি আমরা আমাদের সিনিয়রদের জানিয়েছি।’
রহিমকে উদ্যান এলাকায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুধু কথা বলছিলাম। তাকে মারধর বা অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তার অনেকটাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোনো ধরনের অপহরণ বা জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। পরে সে নিজেই শাহবাগ থানায় যায়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই নিশ্চিত করা হয়েছে যে তার টাকা, মোবাইল বা অন্য কোনো জিনিসপত্র নেওয়া হয়নি এবং তার কোনো ক্ষতিও করা হয়নি।’
ফারদিনের মোটরসাইকেল হলে নেওয়ার বিষয়ে আল শামস বলেন, ‘বাইকটি কেন নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে আমি জানি না।’
অভিযুক্ত সানিয়াত শুভ মোটরসাইকেল চালিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে মন্তব্য করেন, ‘আমি মোবাইলে কথা বলতে ইচ্ছুক না। আপনি এসে সরাসরি কথা বলুন। কোনো ভিডিও থাকলে সেটার বিষয়ে আমি জানি না। আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না।’
হীরা রহমান দাবি করেন, মারামারির সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তার ভাষ্য, ‘আমি সিনিয়রদের ডাক পেয়ে পরে যাই। তখন মারামারি শুরু হয়ে গেছে। আমি কাউকে মারধর করিনি।’
অভি রহমানও মারধরের সময় উপস্থিত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি রাতে জিমে ছিলেন। পরে হলে ফিরে চিৎকার শুনে বাইরে গিয়ে দেখেন ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদলের সিনিয়ররা বিষয়টি মীমাংসা করছেন।
একইভাবে সাদমান সাকিবও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযোগে নাম থাকা অন্য কয়েকজনও ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত থাকার বিষয়টি নাকচ করেছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস জানান, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন তিনি। সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন উল্লেখ করেন, তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল রতন মন্তব্য করেন, কোনো শিক্ষার্থী মোরাল পুলিশিং বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।




