সংশোধিত বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার খসড়া প্রস্তুত
ঋণখেলাপি নন অঙ্গীকার ছাড়া প্রার্থী নয়
- কর ও ভ্যাট পরিশোধের বিষয়টিও বাধ্যতামূলক
- এটি কার্যকর হলে সৎ, নিয়মিত করদাতা এবং স্বচ্ছ ব্যবসায়ীরা নেতৃত্বে আসার সুযোগ পাবেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের বাণিজ্য সংগঠনগুলোর কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখন থেকে যেকোনো বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নিতে হলে প্রার্থীদের আবশ্যিকভাবে ঋণখেলাপি না হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ঋণখেলাপি বা কর ও ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া ব্যবসায়ী কোনোভাবেই এ নির্বাচনগুলোয় প্রার্থী হতে পারবেন না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন-১ শাখা থেকে সম্প্রতি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫-এর এই অধিকতর সংশোধনীর বিষয়টি জানানো হয়েছে। বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২-এর ৩০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার এ নতুন নিয়ম প্রবর্তন করেছে, যা দেশের সব ব্যবসায়ী ও শিল্প সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের দৌড়ে এক বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
নতুন সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে নির্বাচনে আগ্রহী প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় হালনাগাদ কাগজপত্রসহ মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। এই মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীকে অবশ্যই ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি লিখিত আইনি অঙ্গীকারনামা দাখিল করতে হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে যে তিনি কোনো ব্যাংকের ঋণখেলাপি নন।
এর পাশাপাশি প্রার্থীদের জন্য কর ও ভ্যাট পরিশোধের বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রার্থীকে তার হালনাগাদ আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র, সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত আয়কর খেলাপি না হওয়ার প্রত্যয়নপত্র এবং হালনাগাদ মূসক বা ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুনির্দিষ্ট প্রমাণকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের সংঘস্মারক ও সংঘবিধি অনুযায়ী অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিলাদিও জমা দিতে হবে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও নিখুঁত ও প্রভাবশালী মহলের প্রভাবমুক্ত করতে ভোটার তালিকায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বাণিজ্য সংগঠনে যদি একক কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন একাধিক কোম্পানি বা ভিন্ন ভিন্ন টিআইএন ও বিন-সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানও থাকে, তবুও তিনি নির্বাচনে মাত্র একটির বেশি ভোট প্রয়োগ করতে পারবেন না। এ ভোটটি সম্পূর্ণভাবে অহস্তান্তরযোগ্য হবে, যার ফলে ভুয়া বা কৃত্রিম উপায়ে ভোটার সংখ্যা বাড়িয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হচ্ছে।
নতুন বিধিমালায় কমিটির মেয়াদ ও নির্বাচন পদ্ধতিতেও স্পষ্টতা আনা হয়েছে। এফবিসিসিআই বা ফেডারেশনসহ অন্য সব বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ হবে দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে ২৪ মাস বা ২ বছর। তবে বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে যদি কোনো কমিটি এই ২৪ মাস সময়কাল অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই ভেঙে যায় বা অবসায়ন ঘটে, তবে সেটিও একটি পূর্ণ মেয়াদকাল হিসেবেই গণ্য করা হবে।
এ ছাড়া ফেডারেশনের শীর্ষ নেতৃত্ব অর্থাৎ সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি এবং সহসভাপতি পদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে চেম্বার গ্রুপের প্রার্থীরা শুধু চেম্বার গ্রুপের ভোটারদের দ্বারা এবং অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের প্রার্থীরা অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। নির্বাচন বা ফলাফল নিয়ে কোনো প্রার্থীর আপত্তি থাকলে তিনি ফল প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফি দিয়ে আপিল বোর্ডের কাছে আপিল করতে পারবেন এবং আপিল বোর্ডকে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।
সরকারের এ কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী ও তরুণ উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, এতদিন অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের সামাজিক ও আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রাখতেন। নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সৎ, নিয়মিত করদাতা এবং স্বচ্ছ ব্যবসায়ীরা নেতৃত্বে আসার সুযোগ পাবেন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও সুসংহত ও গতিশীল করবে।




