আর্জেন্টিনার অলৌকিকতা এখন স্বাভাবিক

ইতিহাসের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে। যখন কোনো অলৌকিক ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন মানুষ সেটিকে অলৌকিক বলে মনে রাখে না।
আজকের শিশুর কাছে আর্জেন্টিনা মানেই ফাইনাল। বিশ্বকাপ মানেই শেষ দিন পর্যন্ত টিকে থাকা। লিওনেল মেসি মানেই হাসিমুখে ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা। অথচ সে শিশু জানবেই না, একসময় একটি পুরো দেশ শুধু একটি ফাইনালের আশায় অপেক্ষা করেছে বছরের পর বছর!
ইতিহাসের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে। যখন কোনো অলৌকিক ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন মানুষ সেটিকে অলৌকিক বলে মনে রাখে না। তা হয়ে যায় ‘স্বাভাবিক’। এখনকার আর্জেন্টাইন সমর্থকরা ঠিক তাই। তারা হয়তো ভুলেই গেছেন ফাইনালে ওঠা কতটা কঠিন।
১৯৭৮-এ সিজার লুইস মেনোত্তির হাতে বিশ্বকাপ উঠেছিল। ১৯৮৬-তে ডিয়েগো ম্যারাডোনা পৃথিবীকে শিখিয়েছিলেন, একজন মানুষ কখনো কখনো ইতিহাসের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে। আবার ১৯৯০-এ সে স্বপ্ন ভেঙেছিল। তারপর... একটি দীর্ঘ মরুভূমি। ২৮ বছরের অপেক্ষা। যেখানে প্রতিটি জুন মানে নতুন আশা। আর জুলাই মানেই কান্না। ১৯৯৪ সালে ম্যারাডোনার চোখে ছিল অবিশ্বাস। ২০০৬ সালে হোসে পেকারমানের নীরবতা। ২০১৪ সালে মারাকানার অন্ধকার। ২০১৫ ও ২০১৬— টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে মেসির নীরব কান্না ও গোটা জাতির অসহায়ত্ব।
এখানেই ফুটবলের সৌন্দর্য। ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো যেমন কখনো যুক্তি মেনে লেখা হয় না। তেমনি লিওনেল স্কালোনির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ট্রফিতে নয়। তিনি একটি ড্রেসিংরুমকে পরিবারের বাঁধনে বেঁধেছেন। একজন সুপারস্টারের দলকে পরিণত করেছেন একদল সৈনিকের দলে। যেখানে গোল করলে সবাই ছুটে যায়। হারলেও সবাই একসঙ্গে কাঁদে। জিতলেও কেউ একা উদযাপন করে না। ট্যাকটিকস নয়, এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি একে অন্যের জন্য খেলা।
তার হাত ধরেই এ নদীর বাঁক বদলের শুরু। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিল, মারাকানার সেই রাত। ২৮ বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি। ইতালির বিপক্ষে ফিনালিসিমা জয়। কাতারের মরুভূমিতে ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর রূপকথা। যে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল হোঁচট খেয়ে। শেষ হয় মহাবিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ছবিটি দিয়ে— মেসির হাতে বিশ্বকাপ!
তারপর আরেকটি কোপা আমেরিকা। আজ আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল। এটি সংখ্যার গল্প নয়। এটি একটি জাতির হৃৎস্পন্দনের গল্প।
এই দলের গল্প আর শুধু ফুটবলের গল্প থাকছে না। এটি বন্ধুত্বের গল্প। বিশ্বাসের গল্প। পুনর্জন্মের গল্প। একজন অধিনায়কের অসমাপ্ত স্বপ্নপূরণের গল্প। একজন অখ্যাত কোচের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প। আর কোটি মানুষের বুকের ভেতর একসঙ্গে ধুকপুক করা একটি হৃদয়ের গল্প।
হয়তো ২০ বছর পর কোনো এক বাবা তার ছেলেকে নিয়ে পুরনো ম্যাচ দেখবেন। ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে— ‘তোমরা কি সত্যিই এই দলটাকে নিজের চোখে দেখেছিলে?’ বাবা হয়তো কিছুক্ষণ চুপ করে থাকবেন। তারপর আস্তে করে বলবেন— ‘হ্যাঁ। আমরা এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন ফুটবল শুধু খেলা ছিল না। ফুটবল তখন মানুষের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন ছিল।’
আর সেই স্বপ্নের নাম— স্কালোনেতা।




