অদম্য আর্জেন্টিনা আর সুন্দরের স্পেন
ভাগ্য নির্ধারিত হবে মাঝমাঠে

বিশ্বকাপের ফাইনালে লড়াইটা এই দুই বিপরীত শক্তির, যাদের হার-জিতের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে তাদের দলের শিরোপাভাগ্য।
‘বিশ্বকাপ কী করে জিততে হয়’ নামে একটা বই লিখেছেন ক্রিস ইভানস নামে এক ফুটবল সাংবাদিক। আমাজনে ২৫ ডলারের মতো দাম। শীর্ষস্তরের ফুটবলার এবং কোচদের চোখ কপালে তোলার মতো বেতনের তুলনায় অঙ্কটা চীনা বাদামের খোসার চেয়েও তুচ্ছ। বই পড়ে তো আর বিশ্বকাপ জেতা যায় না। সেটি হলে ইভানসের নিজের দেশ ইংল্যান্ডই এবার সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিত না। বিশ্বকাপটা জিততে হয় খেলে আর সেই খেলাটা গড়ে বা ভাঙে হচ্ছে মাঝমাঠে। কিছুটা পকেট স্পেসে, রক্ষণ আর মাঝমাঠের মাঝের খালি জায়গায়। আর্জেন্টিনা আর স্পেন, ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষ যেন একই শক্তির ভিন্ন রূপ। আর্জেন্টিনা যদি হয় বৈশাখী ঝড়, গ্রীষ্মের দুপুরে গা জুড়ানো দখিনা বাতাস। এনসো ফের্নান্দেস, আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টাররা যদি হন দাবানল, রোদ্রি, ফাবিয়ান রুইসরা যেন শীতের রাতে ফায়ারপ্লেসের ওম। বিশ্বকাপের ফাইনালে লড়াইটা এই দুই বিপরীত শক্তির, যাদের হার-জিতের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে তাদের দলের শিরোপাভাগ্য।
এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি ফাউল করা দলটির নাম আর্জেন্টিনা। ৮৮টি ফাউল করেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। এনসো ফের্নান্দেস করেছেন ৯টি ফাউল, আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার করেছেন ৬টি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই দল হিসেবে আর্জেন্টিনা ফাউল করেছে ১৫টি, এর মধ্যে প্রথমার্ধেই ১২টি। এই পরিসংখ্যান দেখেই স্পেনের ডিফেন্ডার আমেরিক লাপোর্তা ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের ওপর একটা আঁচড় কেটে যায়’, কথাটা হয়তো আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলার পর প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা শরীরে অনেকগুলো নতুন দাগ নিয়েই মাঠ ছাড়েন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে কিক অফের ৩ মিনিটের মাথায় এনসো যেভাবে কনুই দিয়ে এলিয়ট হেন্ডারসনের ঘাড়ের পেছনে মেরেও রেফারির চোখ ফাঁকি দিয়েছেন, সেটি দেখেই লাপোর্তা বলেছেন, ‘একজন-দুইজন যদি এভাবে পার পেয়ে যায়, তাহলে তা পুরো মাঠেই বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেয়।’ লাপোর্তা যেটাকে বলছেন ‘বিশৃঙ্খলা’, লিওনেল স্কালোনির কাছে সেটিই কৌশল। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যে কৌশলে খেলছে, বিশ্লেষকরা তার নাম দিয়েছেন ‘কন্ট্রোলড ক্যাওয়াস’ বা নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা। আর্জেন্টিনার রক্ষণ ও মাঝমাঠের ফুটবলাররা শুরুতেই মাঠে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করেন, তাতেই প্রতিপক্ষ এলোমেলো হয়ে যায়। এই এলোমেলো হয়ে যাওয়া পরিস্থিতির সুযোগটাই নেন আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ডরা। লাপোর্তা একদম স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘তবে এটা সত্যি যে, সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে আমরা এমন কিছু জিনিস দেখেছি, যা আমাদের সত্যিই অবাক করেছে— এমন কিছু আচরণ যা সহজে পার পেয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে এটা বেশি প্রযোজ্য। তারা এমন একটি দল, যারা প্রতিপক্ষের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পছন্দ করে। ফুটবল মাঠে বিশেষ করে বড় টুর্নামেন্টগুলোতে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া উচিত নয়। কারণ, এগুলো আপনার মনোযোগ নষ্ট করে দিতে পারে এবং আপনাকে ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে।’
বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো মঞ্চে, যেখানে হিমালয়সম স্নায়ুর চাপ নিয়ে নামবেন একেকজন খেলোয়াড়, সেখানে রাগের মাথায় একটা ভুলই ব্যবধান গড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। স্কালোনি চাইবেন কম বয়সী, অনভিজ্ঞ একদল খেলোয়াড়ের বিপক্ষে এই তাসটাই খেলতে। কারণ, মাত্র চার বছর আগে খাদের কিনারা থেকে বিশ্বকাপ জেতা একটা দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়কেই স্কালোনি পাচ্ছেন মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
আর্জেন্টিনার ঠিক উল্টো দর্শন স্পেনের। তারা ফ্রান্সের ক্ষুরধার আক্রমণভাগকেও আটকে দিয়েছে একের পর এক পাসের ফাঁসে। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৬৯৪টি পাস দিয়েছেন স্পেনের রোদ্রি, তার পাসের নিখুঁততা ৯৩ শতাংশ। ফাবিয়ান রুইস সব ম্যাচে শুরুতে নামেননি, তাই তার পাসের সংখ্যা কিছুটা কম, ২৪৬টি। তিনিও ৮৯ শতাংশ পাস সতীর্থের পায়ে পৌঁছে দিয়েছেন। দল হিসেবে স্পেন পাস দিয়েছে ৪ হাজার ৫৯২টি, যার ৯১ শতাংশই ছিল সঠিক। আর্জেন্টিনাও ৪ হাজার ৭৭২টি পাস খেলেছে, তাদেরও ৯১ শতাংশ পাস ছিল নিখুঁত। ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড লাইনে বল জোগানোর দায়িত্ব ছিল মাইকেল ওলিসের। তাকে সেমিফাইনালে বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন রুইস আর রোদ্রি। দুজনই চারবার করে সফল ট্যাকল করে বল জিতেছেন ওলিসের কাছ থেকে। আর মার্ক কুকুরেয়া তো ওলিসেকে রীতিমতো পকেটেই ভরে রেখেছিলেন! ম্যাচের পর স্প্যানিশ ফুটবলাররা যখন উল্লাস করছিলেন, তখন গ্যালারি থেকে করা ভিডিওতে ধরা পড়ে কুকুরেয়ার উদ্দেশে রুইসের প্রশংসা, ‘তুমি তো ওকে একেবারে গিলে খেয়েছ, এবার তো পকেট থেকে বের করো!’ লুই দে লা ফুয়েন্তে যদি একই কৌশল অবলম্বন করেন, অর্থাৎ রুইস ও রোদ্রির ‘ডাবল পিভট’ এবং সঙ্গে উইংব্যাক হিসেবে কুকুরেয়ার ভেতরের দিকে চেপে আসা, তাহলে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠটাও হয়তো অকেজো করে দেওয়া সম্ভব। এরপরও যদি কোনো আলগা বল বের হয়ে যায়, তাহলে তো পাউ কুবারসি আর লাপোর্তা তো আছেনই!
স্পেনের ফুটবল একাডেমিগুলোতে যখন শিশু বা কিশোররা ভর্তি হয়, তখন শুরুতে তাদের নির্দিষ্ট কোনো জায়গা বা ছকে বেঁধে খেলা শেখানো হয় না। বছর দুয়েক চলে শুধু বল নিয়ন্ত্রণ আর পাস দেওয়ারই অনুশীলন। অল্প জায়গায় নিজেদের ভেতর পাসের আদান-প্রদানের মাধ্যমে বলের দখল বজায় রাখা। লা ফুয়েন্তের এই দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই স্পেনের বয়সভিত্তিক দল থেকে উঠে আসা, যারা এই কৌশলে খেলতেই অভ্যস্ত। আর্জেন্টিনা যেখানে চাইবে শুরুতেই একটা অস্থিরতা সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষের মনোযোগ নষ্ট করতে, সেখানে স্পেনের কৌশল হলো একের পর এক পাসের বুননে বলের দখল নিজেদের কাছে রাখা এবং জোরালো সুযোগ তৈরি হলে তবেই গোলে শট নেওয়া। বিশৃঙ্খলা আর নিয়ন্ত্রণের এই বৈপরীত্যই দুই কোচের কৌশলের প্রধান পার্থক্য। আর্জেন্টিনা ৭ গোল হজম করেছে, দুইবার তারা ম্যাচে আগে গোল খেয়েছে এবং শেষের ১০ মিনিটেই গোল শোধ করে জয়ী হয়ে মাঠ ছেড়েছে। স্পেন এখন পর্যন্ত গোল হজমই করেছে মাত্র একটি এবং কোনো ম্যাচেই আগে গোল হজম করেনি। ফাইনালটা তাই হতে যাচ্ছে দুই বিপরীত দর্শনের শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় পাসের পুরস্কার বিশ্বকাপ।




