জুলাই অভ্যুত্থান
দুই বছরেও শুকায়নি শহীদ হৃদয়ের পরিবারের চোখের জল

ছেলের কবরের পাশে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন শাহ আলম হাওলাদার। ছবি: আগামীর সময়
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের একজন ছিলেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার হৃদয় আহমেদ শিহাব (১৭)।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী এই কিশোরের মৃত্যুর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো কাটেনি তার পরিবারের শোক, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকট।
হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি তার পরিবারের।
হৃদয় শিবচর উপজেলার সন্যাসীরচর ইউনিয়নের আজগর হাওলাদারকান্দি গ্রামের শাহ আলম হাওলাদার ও নাছিমা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে। একটি ছোট বোন রয়েছে তার।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভারী কাজ করার সক্ষমতা হারান শাহ আলম হাওলাদার। এরপর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় হৃদয়। ঢাকায় ফুপাতো ভাইয়ের ফার্নিচারের দোকানে কাজ নেয়। এরপর থেকে নিজের খরচ চালিয়ে নিয়মিত বাবা-মায়ের কাছে টাকা পাঠাতো সে। সেই আয়েই চলত তাদের সংসার খরচ।
পরিবার জানায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে এক আত্মীয়ের বাসায় খাবার খেয়ে কর্মস্থলে ফিরছিল হৃদয়। পথে রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় আন্দোলনের মধ্যে পড়ে হৃদয়। টিয়ারশেলের ধোঁয়ার মধ্যে একটি গুলি তার শরীরে বিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ছেলের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মা নাছিমা বেগম। তিনি বলেছেন, ‘১৮ জুলাই রাতে ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। হৃদয় জানিয়েছিল, শুক্রবার সকালে বাড়ি আসবে। আমি ছেলেকে শুধু সাবধানে থাকতে বলেছিলাম।’ তার ভাষ্য, ‘‘ছেলের শেষ কথা ছিল, ‘মা, তুমি চিন্তা করো না।’ ওই কথাটাই ছিল আমার ছেলের শেষ কথা।’’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বিকালে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাই। রাতে জানতে পারি, আমার বাবাটা আর বেঁচে নেই। এখনো মোবাইলে ওর ভিডিও দেখি। মনে হয়, এই বুঝি ‘মা’ বলে ডাকবে।’
হৃদয়ের স্বপ্ন ছিল ইতালি গিয়ে কাজ করে পরিবারের দারিদ্র্য দূর করা। নতুন ঘর নির্মাণ এবং পরিবারের ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনার কথাও তিনি প্রায়ই মাকে জানাতেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
বাবা শাহ আলম হাওলাদারও ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেছেন, ‘আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল? বাবা হয়ে সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়ার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন।’
সরেজমিন দেখা যায়, একটি ছোট টিনের ঘরে বসবাস করছেন শাহ আলম ও নাছিমা দম্পতি। বসতভিটা ছাড়া তাদের আর কোনো জমিজমা নেই। সেলাইয়ের কাজ করে সামান্য আয় করেন নাছিমা বেগম। এ ছাড়া জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ টাকার এফডিআরের মুনাফা দিয়ে কোনোমতে চলছে সংসার।
হৃদয়ের ছোট বোন সাথী আক্তার বলেছে, ‘অনেকেই সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তেমন সহায়তা পাওয়া যায়নি। পরিবারের নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস নেই।’
হৃদয়ের চাচা সাহাবুদ্দিন হাওলাদার জানিয়েছেন, বড় ভাইয়ের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন হৃদয়। তার মৃত্যুর পর পরিবারটি পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শহীদ হৃদয়ের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পাওয়া সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তাদের কাছে। পরিবারের অনুরোধে হৃদয়ের কবর সংরক্ষণ ও নামফলক স্থাপন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া গেলে সহযোগিতা করা হবে পরিবারটিকে।





