জনকল্যাণেই আনন্দ রহিমের

রাস্তা মেরামত করছেন আবদুর রহিম। ছবি: আগামীর সময়
যে বয়সে তরুণরা নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে ব্যস্ত, সেই বয়সে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়েই পথ চলছেন ২১ বছরের আবদুর রহিম। ভাঙা সড়ক মেরামত, অকেজো টিউবওয়েল সচল করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো— নিঃস্বার্থ মানবিক কাজেই তিনি হয়ে উঠেছেন মাধবপুরের মানুষের প্রশংসার নাম।
টানা বৃষ্টিতে মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন বাজার-রামেশ্বর সড়কের গাড়াউক গ্রামের কাছে একটি অংশ ভেঙে টানা তিন দিন যান চলাচল বন্ধ ছিল। কয়েক গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ দেখে প্রশাসনের অপেক্ষায় না থেকে গত ৪ মে নিজেই কাজে নেমে পড়েন রহিম। প্রথমে বাঁশ গেড়ে ও মাটি ফেলে সফল হননি। পরে এক পরিচিত ব্যক্তির সহযোগিতায় দুই হাজার ইট সংগ্রহ করে নিজ উদ্যোগে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করেন। এতে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হয়।
আবদুর রহিমের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাপড়তলা ইউনিয়নের খান্দুরা গ্রামে। ব্যবসায়ী মাসুক মিয়ার ছেলে তিনি। রহিম সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে ষষ্ঠ। চার ভাই মালদ্বীপ ও এক ভাই ইতালিপ্রবাসী। দুই বছর ধরে মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন বাজারে বাবার মুদি ব্যবসায় দায়িত্ব পালন করছেন। সেই ব্যবসার আয়ের একটি অংশ ব্যয় করেন মানবকল্যাণে।
২০২৩ সাল থেকে শুরু হয় তার মানবিক কাজ। মাধবপুরের রতনপুর বাসস্ট্যান্ড, ছাতিয়াইন স্কুলমাঠ, ছাতিয়াইন বাজারসহ হবিগঞ্জের মাধবপুর ও পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ১২টি স্থানে দীর্ঘদিনের অকেজো নলকূপ নিজ অর্থায়নে মেরামত করেছেন। হাসপাতাল চত্বর, স্কুল, হাট-বাজার ও মসজিদের অজুখানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, অসহায় মানুষের ঘর নির্মাণে সহযোগিতা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের হুইলচেয়ার প্রদান এবং দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তা করে আসছেন নিয়মিত।
২ জুলাই ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে নিজ খরচে প্রায় ৭ হাজার টাকা ব্যয়ে সুপারিগাছের ৬০টি চারা রোপণ করেন। গত রমজান মাসে মাধবপুরের ছাতিয়াইন, রামেশ্বর, পৈলাবাড়ি এবং নাসিরনগরের খান্দুরা গ্রামের শতাধিক অসহায় পরিবারের মধ্যে ১ কেজি করে মাংস ও ইফতারসামগ্রী বিতরণ করেন।
আবদুর রহিমের এসব মানবিক কাজে আর্থিক সহায়তা করেন তার প্রবাসী পাঁচ ভাই, পরিবারের সদস্য এবং তার পরিচিত অনেক প্রবাসী বন্ধু। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার বন্ধুরা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সহযোগিতা করেন।
দাসপাড়া গ্রামের মঈন উদ্দিন মনির জানালেন, ছাতিয়াইন স্কুলমাঠের পাশের নলকূপটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো ছিল। রহিম সেটি পরিষ্কার করার পর এখন প্রতিদিন শত শত পথচারী ও শিক্ষার্থী সেখান থেকে বিশুদ্ধ পানি পান করছেন। এমন কাজ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক ফজলুর রহমানের কথা ‘আজকের সমাজে অনেক তরুণ নিজের কথাই বেশি ভাবেন। কিন্তু রহিম এর ব্যতিক্রম। সে মানুষের উপকারের জন্য কাজ করে। এমন তরুণদের উৎসাহ দেওয়া উচিত।
ছাতিয়াইন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মিডওয়াইফ আফরোজা খাতুন বললেন, ‘হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার রাখতে রহিমকে বহুবার স্বেচ্ছাশ্রম দিতে দেখেছি। কোনো স্বার্থ ছাড়াই মানুষের জন্য কাজ করার এমন মানসিকতা সত্যিই বিরল।’ ছাতিয়াইন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন লিটনের ভাষ্য, ভাঙা রাস্তা মেরামত থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক কাজে রহিমের অংশগ্রহণ অন্য তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করবে।
আবদুর রহিম বললেন, ‘মানুষের মুখে হাসি দেখাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যতদিন সুস্থ থাকব, ততদিন পরিবার, পাঁচ প্রবাসী ভাই, প্রবাসী বন্ধু ও স্বেচ্ছাসেবী বন্ধুদের সহযোগিতায় মানুষের সেবায় কাজ করে যাব।’




