স্প্যানিশ ছন্দ
ক্লাসিক ফাইনালের অপেক্ষায় পৃথিবী

লামিন ইয়ামাল
দুই কোচই একই দর্শনে বিশ্বাসী। দর্শনটা হলো পাসিং ফুটবল, পজিশনাল প্লে এবং বলের নিয়ন্ত্রণ। টেক্সটবুক অনুযায়ী এই হলো লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও লিওনেল স্কালোনির খেলার স্টাইল। খেলা একই ধরনের হলে মজাটা ঠিক উপভোগ করা যায় না। আর্জেন্টিনা ও স্পেন দুই ফাইনালিস্ট একই স্টাইলে খেলবে মানে বার্সেলোনা ও ক্লোন বার্সার খেলা দেখা।
এমন সরলীকরণ করলে হবে না। কারণ, এ ফুটবল দর্শন স্কালোনির হাতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর সঙ্গে লাতিন আবেগ, লড়াকু মানসিকতা আর মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য যোগ করেছেন আর্জেন্টাইন কোচ। ফলে আর্জেন্টিনা শুধু বল দখলে রেখে খেলে না, ম্যাচের প্রয়োজনে করে অনেক কিছু। দে লা ফুয়েন্তের স্পেন এখনো বিশ্বাস করে নিয়ন্ত্রণই শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা, শৃঙ্খলাই বড় আক্রমণ। তাদের ফুটবল যেন নিখুঁতভাবে লেখা এক সিম্ফনি, যেখানে প্রতিটি পাস বা দৌড়ের উদ্দেশ্য আছে। তাই আজ নিউ জার্সির এই ফাইনালটি শুধু আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের নয়, একই দর্শনের দুটি রূপের দ্বৈরথ। একটি আবেগে উষ্ণ, অন্যটি নিয়ন্ত্রণে শীতল।
এই স্পেন আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ২০১০ বিশ্বকাপের সেই সোনালি দিনে। জাভি-ইনিয়েস্তা-বুসকেতসদের পায়ে যে পাসিং ফুটবল স্পেনকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছিল, রোদ্রি-ওলমো-ওয়ারসাবালদের এই দলটি যেন তারই আধুনিক সংস্করণ। নিখুঁত পাস, অবস্থানগত শৃঙ্খলা আর বলের ওপর কর্তৃত্বে তারা টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত। এ ধারাবাহিক সাফল্য দীর্ঘদিন ধরে লালিত একটি ফুটবল দর্শনের সার্থকতাও প্রমাণ করে।
এই দলের বেশিরভাগ ফুটবলারকে কৈশোর থেকে গড়ে তুলেছেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ফলে কোচের দর্শন শুধু তাদের কৌশলে নয়, যেন মিশে আছে রক্তে-মাংসে। তাদের বোঝাপড়া এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত যে, প্রতিপক্ষ অনেক সময় নিজেকে এমন এক আলোকোজ্জ্বল গোলকধাঁধায় আবিষ্কার করে, যেখানে চারদিকে শুধু লাল-জার্সির ছায়া। ফ্রান্সের হয়েছিল এই অবস্থা, তাই বেরিয়ে আসার কোনো পথই খুঁজে পায়নি। স্পেন শুধু ম্যাচ নিয়ন্ত্রণই করে না, প্রতিপক্ষের সময়, ছন্দ ও আত্মবিশ্বাসও নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় ধীরে ধীরে।
স্প্যানিশ ফুটবলের অর্কেস্ট্রায় সুর কেটে গেলে আছে নতুন সুর লাগানোর শিল্পী লামিন ইয়ামাল। ইউরো মঞ্চে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই এ কিশোর পুরো ফুটবলবিশ্বকে হতবাক করেছিলেন। এই বিশ্বকাপে তার স্বরূপটা এখনো অপ্রকাশিত। নামের পাশে আছে মাত্র একটি গোল। তবে বড় মঞ্চে আলো নিজের দিকে টেনে নেওয়ার সহজাত ক্ষমতা আছে এ তরুণের। ১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেকের পর থেকেই তার পায়ের জাদুতে মানুষ খুঁজে ফিরছে লা মাসিয়ার সেরা বিস্ময় লিওনেল মেসিকে। হয়তো ইয়ামালও বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে আছেন ৩৯ বছরের আর্জেন্টাইন জাদুকরের দিকে। যে সময় তার পায়ে শিকল পরানোর কথা, সেই মেসি যেন সময়কেই নাচিয়ে চলেছেন নিজের ছন্দে।
কিন্তু কিংবদন্তির তৃপ্তি এবার তাকে একা পাহাড় টেনে তুলতে হচ্ছে না বলে। তার চারপাশে গড়ে উঠেছে একদল অকুতোভয় যোদ্ধা। নকআউট পর্বে হুলিয়ান আলভারেস, এনসো ফের্নান্দেস, লাউতারো মার্তিনেসরা যেন আগুনে পোড়া লোহার মতো আরও ধারালো হয়ে উঠেছেন। ম্যাচ জয়ের ক্ষুধা, শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়ে যাওয়া আর সংকট চিরে আলো খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা এ আর্জেন্টিনার বড় শক্তি।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ফাইনালে ওঠার পথটা মসৃণ ছিল না, বরং কাঁটায় ভরা এক দীর্ঘ যাত্রা। প্রতিটি ম্যাচ যেন একেকটি কঠিন পরীক্ষা, যেখানে সামান্য ভুলও ধূলিসাৎ করে দিত পারত সব। অতিরিক্ত সময়ের উত্তেজনায় কেপ ভার্দেকে পেরিয়ে, এরপর মিসর, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্নায়ুর শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে লড়াই করে ফাইনালের টিকিট কেটেছে স্কালোনির দল। মনে হয়েছে, একদল যোদ্ধা যুদ্ধের ময়দানে নেমেছে হৃদয়টাকে মুঠোয় নিয়ে। প্রতিপক্ষের সঙ্গে এ লড়াইয়ে ছিল চাপ, সংশয় ও বিদায়ের ভয়। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার ম্যাক আলিস্টারও স্বীকার করেছেন, প্রতিটি ম্যাচের আগে তার ভেতরে হারের ভয় কাজ করত।
সেই কঠিন পথের প্রতিটি বাঁকে পথ দেখিয়েছেন লিওনেল মেসি। কখনো জাদুকরের তুলি হাতে, কখনোবা সেনাপতির মতো সামনে দাঁড়িয়ে। তার গোল, অ্যাসিস্ট আর অসম্ভব মুহূর্তগুলো যেন অন্ধকার রাতে জ্বলে ওঠা আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের।
এই জাদুকরের মন্ত্রমুগ্ধ উপস্থিতির সঙ্গে আর্জেন্টিনার আবেগ, আত্মত্যাগ ও লড়াই একাকার হয়ে পৌঁছে গেছে টানা দ্বিতীয় শিরোপার দোরগোড়ায়। তবে সামনে দাঁড়িয়ে স্পেনের ছন্দময় পাসিং ও আগ্রাসী প্রেসিং ফুটবল। আবেগ আর সৌন্দর্য, লড়াই আর শৃঙ্খলা— এ দুই বিপরীত স্রোতের মিলনেই নিউ জার্সিতে আজ রাতে লেখা হবে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়।




