যুক্তরাষ্ট্র শর্ত মানলেই খুলে যাবে হরমুজ

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী
‘যুক্তরাষ্ট্র যখনই ইরানের শর্ত মেনে নেবে, তখনই নিশ্চিতভাবেই খুলে যাবে হরমুজ প্রণালি’— গতকাল এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেছেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র সরদার মোহেবি। বলেছেন, “হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি ইরানের ‘সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি ও শর্তাবলি’র ওপর নির্ভরশীল। ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালি শুধু অর্থনৈতিক জলপথ নয়। বরং এটি ভৌগোলিক ও কৌশলগত শক্তির অংশ।”
ওমানের সঙ্গে চুক্তির খুব কাছাকাছি ইরান: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে তেহরান একটি চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ পৌঁছেছে। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে আগে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেছেন। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের ৫ নম্বর ধারা বাস্তবায়ন করছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, এক মাসের মধ্যে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসার কথা ছিল। এ প্রসঙ্গে আরও যোগ করেন, দুই সপ্তাহের মধ্যেই হরমুজ ‘স্বাভাবিক অবস্থার ৬০ শতাংশে’ পৌঁছে গিয়েছিল। তেহরানের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন পথ তৈরির চেষ্টা করার জন্য আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেছেন।
হরমুজ অবরোধে তেল রপ্তানি কমেছে ৭৫ শতাংশ: ইরাকের তেলমন্ত্রী বাসেম মোহাম্মদ খুদাইর জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে খুদাইর উল্লেখ করেন, যুদ্ধের আগে ইরাক দৈনিক রপ্তানি করত প্রায় ‘৩৪ লাখ ব্যারেল’ তেল। তিনি রপ্তানির পথ বা মাধ্যমগুলোতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে ‘ভবিষ্যৎ সমাধান খোঁজার’ ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বর্তমানে ইরাক ‘দৈনিক ২৭ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে এবং ১৫ থেকে ১৭ লাখ ব্যারেল রপ্তানি করে’ বলেও যোগ করেন তিনি।
আরব আমিরাতের ট্যাংকারে হামলার নিন্দা: আরব আমিরাতের ট্যাংকারে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। একটি বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ হামলার ঘটনায় দেশটির পক্ষ থেকে তীব্র ‘নিন্দা ও ধিক্কার’ জানিয়েছে। সেখানে ইরানের হামলাকে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে।
ইরানকে হরমুজের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার প্রস্তাব: গত বুধবার কয়েকটি ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছিল, পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যে চুক্তির প্রস্তাব করেছে ওমান, তাতে হরমুজ দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের নিয়ন্ত্রণ তেহরানকে দেওয়া হতে পারে। এটিকে ইরানের জন্য বড় ধরনের ছাড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্ববাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র আপত্তি ছিল। এখন দেশটির নীতিনির্ধারকরা চুক্তির এই মূল শর্তটি পরিবর্তন করতে পেরেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান তাদের অনুমতি ছাড়া চলাচল করা তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আঘাত হানছে। এতে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়ে তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি অনেকটাই বেড়েছে।
গত শনিবারও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় তাদের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির একটি জাহাজে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে দেশটির গণমাধ্যমে হামলার বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও এতে ইরানের সংশ্লিষ্টতার খবর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এর আগে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডনক) গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে তাদের মোট ১৫টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এতে তাদের একজন কর্মী নিহতসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যমগুলো প্রায়ই নির্দেশ অমান্যকারী জাহাজে হামলার খবর প্রকাশ করে। তবে হামলাকারী হিসেবে সরাসরি ইরানের নাম উল্লেখ করে না। এদিকে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিতসাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও জাহাজে আক্রমণ জোরদার করেছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ জটিল। চলমান পাল্টাপাল্টি হামলার প্রেক্ষাপটে হরমুজ আবার চালু হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।




