কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে গাছ না লাগিয়েই লোপাট ৫০ কোটি টাকা
- লোপাট ৫০ কোটি
- বাজেট ১৯ লাখ ৬৫ হাজার, বিল ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা
- অডিটে ধরা পড়ার পর করা হয় নামমাত্র বৃক্ষরোপণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কথা ছিল কর্ণফুলী টানেল এলাকা সাজবে সবুজে। ৭৮টি স্পটে লাগানো হবে বাহারি জাতের গাছ। কোথায় কতটি, কোন প্রজাতির— তা ঠিক করতে নেওয়া হয়েছিল পরিবেশবিজ্ঞানীর পরামর্শও। গাছ লাগানোর সে গল্পে শেষ পর্যন্ত গাছই থাকল না। থাকল শুধু বিল। প্রকল্পে গাছের জন্য যেখানে বাজেট ছিল ১৯ লাখ ৬৫ হাজার, সেখানে শেষ পর্যন্ত বিল দেওয়া হয়েছে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। প্রাথমিক হিসাবের প্রায় ২৫১ গুণ। অথচ শুরুতে গাছ না লাগিয়েই বিল হাপিস করে দেন ঠিকাদার। অডিটে ধরা পড়ার পর করা হয় নামমাত্র বৃক্ষরোপণ।
৭৮টি স্পটের মধ্যে দুটি পরিদর্শন করেছেন আগামীর সময়ের প্রতিবেদক। পতেঙ্গা প্রান্তের দুই স্পটে আছে ২২৬টি গাছ, যার বেশিরভাগ বোতল পাম ও রঙ্গন। সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এই দুই স্পটের গাছ লাগাতেই ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি চারার দাম পড়েছে গড়ে ৫৬ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক ও সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে গাছ লাগাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং ঠিকাদার যে টাকা নিয়েছেন, তা যথার্থ কি না— নথিপত্র না দেখে বলা যাবে না। বিষয়টি তদন্তাধীন। দুদকেও মামলা হয়েছে। আইএমইডির প্রতিবেদন নিয়েও কাজ চলছে।’
যেসব গাছ লাগানো হয়েছে, খুচরা বাজারে এসব গাছের দাম ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। বোতল পাম কিছুটা দামি— অনলাইনে এর সর্বোচ্চ দাম দেড় হাজার টাকা। নগরের মুরাদপুরের সবুজ মেলা নার্সারির মোহাম্মদ তৌহিদ ও দেওয়ানহাটের বনফুল নার্সারির মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, অরেঞ্জ জেসমিন ১০০-১৫০, থুজা ২০০-২৫০, বোগেনভিলিয়া ১০০-১৫০, আম ২০০-২৫০ এবং লিচু ও জাম ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। নগরের ছয়টি নার্সারিতে খোঁজ করেও টানেলে লাগানো বোতল পাম পাওয়া যায়নি। তবে অনলাইনে ‘বনায়ন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান এটি দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করছে।
গাছ না লাগিয়েই ব্যয় দেখানোর ঘটনায় আপত্তি দিয়েছে সরকারি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিজিএ)। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এটিকে ‘উদ্বেগজনক ও গুরুতর আর্থিক অনিয়ম’ বলেছে। প্রকল্প শেষে সরেজমিন যাচাই ও জরিপ করে গাছের সংখ্যা, প্রজাতি ও টিকে থাকার হার নিরূপণের সুপারিশও করেছিল আইএমইডি। সেটি করেনি সেতু কর্তৃপক্ষ। অডিট আপত্তির পর এখন সেখানে নতুন করে ১৯ হাজার ১৮০টি চারা রোপণ করছে তারা।
বৃক্ষরোপণের পরামর্শক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. কামাল হোসেন। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বৃক্ষরোপণের আগে প্রকল্পের লোকজন আমার পরামর্শ নিয়েছিল। কোথায় কী গাছ লাগাবে, তার নকশাও দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা নকশা অনুযায়ী গাছ লাগায়নি। ২৩ প্রজাতির গাছ লাগানোর নকশা দিলেও উদ্বোধনের আগে তাড়াহুড়ো করে কিছু গাছ লাগিয়ে দায় সেরেছে।’
টানেল এলাকায় ৫০ কোটি টাকার গাছ লাগানোর কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সিনিয়র প্রকিউরমেন্ট স্পেশালিস্ট এবং সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (বর্তমানে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি) সাবেক মহাপরিচালক অমূল্য কুমার দেবনাথ। তিনি বলেছেন, ‘এত গাছ লাগানোর জায়গা কোথায় সেখানে? ইপিসি টার্নকি চুক্তি বলে তো কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়া যাবে না। যত টাকা বরাদ্দ আছে, সে অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না, তা বুঝে নেওয়া প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব। সেটি না করে টাকা দিয়ে দিলে এ দায়ভার তারা এড়াতে পারেন না। কাজটা বুঝে নিয়েই তো তারা বিলে স্বাক্ষর করবেন। তা না হলে এখানে অবশ্যই অনিয়ম হয়েছে।’
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্ণফুলী টানেল সাইট অফিসের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও উপপ্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘এটি নিয়ে অডিট আপত্তি আছে। এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তাই কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানালেন, জিটুজি পদ্ধতিতে ইপিসি টার্নকি প্রকল্প হওয়ায় গাছের জন্য এককালীন নির্দিষ্ট বরাদ্দ ছিল। সে অনুযায়ী চীনা ঠিকাদারকে টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিসিসিসি) বাংলাদেশের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ প্যাং মিংয়ের কাছে ইমেইলে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও গতকাল রবিবার রাত ৮টা পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
২০১৫ সালে একনেকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল প্রকল্প অনুমোদন পায়। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের পর শুরু হয় যান চলাচল। ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে জিটুজি পদ্ধতিতে টানেলটি নির্মাণ করে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিসিসি।
২০১৩ সালে সিসিসিসি ও অরুপ জেভি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন দেয়। এতে পরিবেশগত প্রভাব ও পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনায় গাছ কাটা ও রোপণের রূপরেখা ছিল। টানেল ও সংযোগ সড়কের জন্য পতেঙ্গায় ৬৬টি এবং আনোয়ারায় ৭১৪টিসহ ৭৮০টি গাছ কাটার কথা বলা হয়।
কাটা গাছের ক্ষতিপূরণ ও নতুন গাছ লাগানোর জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে ১৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকার বাজেট ছিল। এর মধ্যে গাছের ক্ষতিপূরণ ১২ লাখ ৭ হাজার ৯৫০, ফলদ গাছের কাঠের মূল্য ৬ লাখ ৩০ হাজার ৬০০ এবং চারা রোপণ ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। টানেল অ্যালাইনমেন্টে শব্দদূষণ কমাতে স্থানীয় গাছ ও গুল্ম দিয়ে বনায়নের কথাও ছিল। কিন্তু প্রকল্প শেষে গাছ না লাগিয়েই ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪৬৫ টাকা ব্যয় দেখানোর অভিযোগ তুলেছে সিজিএ। এটিকে ‘গুরুতর আর্থিক অনিয়ম’ (এসএফআই) উল্লেখ করে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান বলেছে, বৃক্ষ ও ঝোপঝাড় না লাগিয়েই এই অর্থ ব্যয় দেখানোয় প্রকল্পের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
চলতি বছর ৩০ জুন কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইএমইডি। সেখানে বিষয়টিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গাছ না লাগিয়েই ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ এ ব্যয়ের উল্লেখ নেই প্রকল্পের সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) বা প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) কোনোটিতেই। নীতিগত দলিলে উল্লেখ নেই— এমন খাতে অর্থ ব্যয় দেখানোকে গুরুতর অনিয়ম বলেছে আইএমইডি।
ক্রয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে পতেঙ্গা প্রান্তের ওজন স্কেল, প্রশাসনিক ভবন, টোল প্লাজা কমপ্লেক্স ও সংযোগ সড়কের ৭৮টি স্থানে গাছ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ছিল অরেঞ্জ জেসমিন, থুজা, বোগেনভিলিয়া, আম, লিচু ও কাঁঠাল। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন চুক্তিতে বৃক্ষরোপণের ‘বিল অব কোয়ান্টিটি’ (বিওকিউ) না থাকায় কতটি গাছ লাগানোর কথা ছিল এবং কতটি লাগানো হয়েছে, তা যাচাই করতে পারেনি আইএমইডি।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বিপুল ব্যয়ের পেছনে চুক্তির কাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়েছে। জিটুজি ভিত্তিতে ইপিসি টার্নকি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। এ চুক্তিতে বৃক্ষরোপণ ও ল্যান্ডস্কেপিংয়ের জন্য পৃথক কোনো বিল অব কোয়ান্টিটি ছিল না। ফলে কতটি ও কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে, তার একক মূল্য কত— কিছুই নির্ধারিত ছিল না। আইএমইডির পর্যালোচনায় ইঙ্গিত করা হয়েছে, এ সুযোগে সামান্য গাছ লাগিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে পুরো খাতের অর্থ।



