শিশুদের সংগীত শিক্ষায় উয়েরার গুরুগৃহ

গুরুগৃহে লোকগানের আসরে উয়েরা সেথের
এক অচেনা মাটির সুর একদিন ছুঁয়ে গিয়েছিল উয়েরা সেথেরের হৃদয়। সেই সুরের টানে আজ তার হাত ধরে উত্তরাঞ্চলের শত শত শিশু বিনা খরচে শিখছে তাদের মাটির গান, মাটির সুর।
গ্ৰামীণ মেঠোপথ ধরে এগোলেই গুরু রাধারানীর বাড়ি, জীর্ণ টিনের ঘর। এই ঘরে সপ্তাহের দুদিন চলে লোকগানের পাঠ। দৃশ্যটি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিম খান ইউনিয়নের নাওথোয়া গ্ৰামের মায়ালয় গুরুগৃহের।
নরওয়ের কবি, আলোকচিত্রী ও গবেষক উয়েরা সেথের ১৯৯৮ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসেন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল পরিদর্শনে এসে তিনি চরের নারীদের কণ্ঠে শুনেছিলেন মারফতি ও মুর্শিদি গান। ভাষা তার অচেনা, মানুষগুলো তার অপরিচিত। কিন্তু সেই অচেনা ভাষার সুর তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। সেই সুরের টানেই আজ তিনি উত্তরাঞ্চলের শত শত শিশুর কাছে পরিচিত ‘গানের মানুষ’ হিসেবে।
সুরের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে তিনি একে একে পরিচিত হন লালন, বাউল, ভাওয়াইয়া, মারফতি ও মুর্শিদি গানের সঙ্গে। এরপর কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটের লোকশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মায়ের তরী নামে একটি সংগঠন।
সংগঠনটির তত্ত্বাবধানে দুই জেলার বিভিন্ন গ্রামে ৯টি গুরুগৃহ ও লোকবাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব গুরুগৃহ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উদ্দেশ্য সংগীতের প্রতি আগ্রহী শিশুদের বিনা খরচে লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্রের তালিম দেওয়া। গুরুগৃহগুলোয় ৬০০ শিশু এবং দুটি লোকবাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১২৫ শিশু প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এখানে শেখানো হয় লালন, বাউল, ভাওয়াইয়া, মারফতি-মুর্শিদি গানসহ একতারা, দোতারা, বাঁশি, খমক, সারিন্দা, তবলা, বাংলা ঢোল ও বেহালার মতো বাদ্যযন্ত্র।
শিক্ষার্থী বলরাম চন্দ্র রায় (১৪) আগামীর সময়কে বলছিল, ‘আমাদের এখানে প্রধান গান লালন। পাশাপাশি বাউল, ভাওয়াইয়া, মারফতি ও মুর্শিদি গানও শিখি। এখানে আমরা শুক্র ও শনিবার— দুদিন গান শিখি।’
মায়ালয় গুরুগৃহের গুরুমা রাধারানীর ভাষ্য, ‘আমরা এখানে কোনো ভেদাভেদ করি না। সবাইকে গান শেখাই, কোনো পয়সা নিই না।’
অভিভাবক মনোরঞ্জন চন্দ্র রায় বললেন, ‘এখানে পয়সা-কড়ি লাগে না। তাই আমার মেয়েকে গান শেখানোর জন্য নিয়ে আসি এখানে।’
সংগঠনটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ৯টি গুরুগৃহ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য পুরো অর্থের জোগান দেন উয়েরা সেথের। তিনি প্রতি বছর বাংলাদেশে আসেন। তার প্রতিষ্ঠিত গুরুগৃহগুলো পরিদর্শন করেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গান করেন।
শুধু এখানেই থেমে থাকেননি উয়েরা সেথের। ২০২৪ সালে ফকির লালন সাঁইয়ের ৫৩টি গান নরওয়ের ভাষায় অনুবাদ করে একটি বই প্রকাশ করেছেন।
‘মায়ের তরী’ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেছেন, ‘আমি ২০১৬ সাল থেকে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। আমরা শিক্ষার্থীদের বাংলার লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্র শেখাচ্ছি। আমাদের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
উয়েরা সেথের বললেন, ‘পৃথিবীর যেমন অবস্থা— যুদ্ধ এবং প্রকৃতির বিপর্যয়, তাতে করে এই সমাজকে সুস্থ রাখা খুবই কঠিন। সেখানে আমার মনে হয়েছে লালন, বাউল, মারফতি, মুর্শিদিসহ লোকসংগীত সেই অস্থিরতা থেকে মানুষকে স্থির করতে পারে, মানুষকে মানবিক আর প্রকৃতিপ্রেমী করতে পারে। আর সে কারণে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে আমি এই যাত্রা শুরু করছি। চেষ্টা করছি, শিশুদের লোকসংগীত শিক্ষার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার।’



