বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেই শুরু দ্বিতীয় পদ্মা সেতু
- সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা চলমান
- একই সঙ্গে খোঁজা হচ্ছে ঋণদাতা
- অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন

পদ্মার বুকে আরেকটি সেতু করতে চায় সরকার। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই শুরু হবে এর নির্মাণকাজ। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে নানামুখী তৎপরতাও শুরু করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা চালাচ্ছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। পাশাপাশি চলছে অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ, সম্ভাব্য অর্থায়ন ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ। সমীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন দেশ ও ঋণদাতা সংস্থার সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। এরই মধ্যে চীনের পক্ষ থেকে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএ।
২০০৩-০৫ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বিবেচনা করা হয়েছিল চারটি পথ। এর একটি মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা, এই পথে এরই মধ্যে নির্মাণ হয়েছে পদ্মা সেতু। আগের সমীক্ষার তথ্যকে ভিত্তি করে বাকি পথগুলোয় এখন দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এর সঙ্গে নতুন যুক্ত হচ্ছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া অংশ। দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সমীক্ষার জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
চলতি মেয়াদে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দিক থেকে প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ কারণে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই শুরু করা সম্ভব হবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ।’
‘সবচেয়ে বেশি সময় লাগে ঋণ নিশ্চিত করতে, তিন থেকে ছয় বছর। তবে যে গতিতে কাজ এগোচ্ছে, তাতে তিন বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব’— যোগ করলেন তিনি।
সাধারণত বড় অবকাঠামো নির্মাণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য কি না এবং এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল কতটা— তা নির্ধারণ করা হয় সমীক্ষায়। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের যৌক্তিকতা পাওয়া গেলে তৈরি করা হয় প্রাক-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি)। এতে সম্ভাব্য ব্যয়, সময় ও অন্যান্য বিষয় তুলে ধরা হয়। এরপর খোঁজা হয় অর্থায়নের উৎস। বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ঋণদাতা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে। অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর তৈরি হয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি)। তা অনুমোদনের জন্য যায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক)। অনুমোদনের পর বিস্তারিত নকশা, পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগ এবং ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন কাজ শেষে শুরু হয় মূল নির্মাণকাজ।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্পের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগে। তবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে সমীক্ষা চলার সময়ই সম্ভাব্য অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে প্রচলিত ধারার বাইরে কিছু কাজ পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর পরিকল্পনার শিকড় অবশ্য বর্তমান সময়ের নয়। ২০০৩-০৫ সালে জাইকার সমীক্ষায় পদ্মা নদীর ওপর চারটি সম্ভাব্য পথ বিবেচনা করা হয়েছিল— মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া থেকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, ঢাকার দোহার থেকে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন, মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা এবং চাঁদপুর থেকে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ। নদীর গতিপ্রকৃতি, ভবিষ্যৎ যান চলাচল, সড়ক যোগাযোগ, প্রকৌশলগত সম্ভাব্যতা, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করে পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ ও মাওয়া-জাজিরা পথকে পরবর্তী বিশদ সমীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়। শেষ পর্যন্ত মাওয়া-জাজিরা পথেই নির্মিত হয় বর্তমান পদ্মা সেতু।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে নতুন করে এসেছে আলোচনায়। সরকার গঠনের পরও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। কোন পথে সেতু হবে, নকশা কেমন হবে, সেতুর মাধ্যমে পাবনাকে যুক্ত করা সম্ভব কি না এবং এতে রেললাইন থাকবে কি না— এসব বিষয়ও বিবেচনাধীন।
তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট ও অন্যান্য বিষয় সমীক্ষার ফলের পাশাপাশি নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন বিবিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সবকিছু সমীক্ষার ওপর নির্ভর করার কথা থাকলেও বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাওয়া-পাওয়ার প্রভাব থাকার আশঙ্কা থাকে। তাই চূড়ান্তভাবে কোন পথে সেতু হবে এবং এতে রেললাইন যুক্ত হবে কি না— তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করতে পারে।
বিবিএর তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর জন্য অন্তত তিন ধরনের অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে ‘ওয়াই’ আকৃতির সেতুর একটি ধারণায় মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী ও পাবনায় তিনটি প্রান্ত রাখার কথা বলা হচ্ছে। এতে সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার হতে পারে। আবার উল্টো ‘সেভেন’ আকৃতির অ্যালাইনমেন্টের মাধ্যমেও তিন জেলাকে যুক্ত করার ধারণা রয়েছে। অন্যদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ার মধ্যে সেতুর দৈর্ঘ্য পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে সীমিত রাখা গেলে কমতে পারে প্রকল্পের ব্যয়।
বিবিএর আরেক কর্মকর্তা বলছিলেন, সরকারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর প্রস্তুতি এগিয়ে রাখা হচ্ছে ঠিকই, তবে এখনই মূল নির্মাণকাজে যাওয়ার মতো অবস্থান তৈরি হয়নি। সরকারের অগ্রাধিকারে বর্তমানে মেট্রোরেল, মনোরেল ও ভোলা সেতুর মতো প্রকল্পও রয়েছে। তার মতে, বাস্তব প্রয়োজনের দিক থেকে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর আগে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে সব প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখা গেলে নির্বাচনের আগে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধনের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ফায়দা দিতে পারে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক বললেন, ‘বড় প্রকল্পগুলো মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হয়। আওয়ামী লীগও প্রচুর রাজনৈতিক প্রকল্প করেছে। সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় সবকটিতে পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। একটা বড় সড়ক বা সেতুর সুফল পেতে হলে আশপাশের সড়কগুলোও উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের গতি হানিফ ফ্লাইওভারে এসে আটকে যাবে। বর্তমান সরকারও যেন শুধু রাজনৈতিক কারণে বড় প্রকল্প হাতে না নেয়— সেই প্রত্যাশা করব।’
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পথে আগের একটি সমীক্ষায় সেতুটির সম্ভাব্য দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছিল ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। প্রস্থ ১৮ দশমিক ১ মিটার এবং দুই প্রান্তে সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার ধরা হয়েছিল। নদীশাসনের কাজ দুই প্রান্তে প্রায় ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার করার কথা ছিল। ওই সমীক্ষায় প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাতের ভাষ্য, ‘নদীর গতিবিধি দেখা দরকার। সেতুর কারণে কেমন প্রভাব পড়ল, সেটি পর্যবেক্ষণ না করে আরেকটি সেতু নির্মাণের ভাবনা অন্যায়। আরেকটি সেতু নির্মাণে পদ্মার মৃত্যু হবে না— এ নিশ্চয়তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তবে স্বাভাবিক নিয়মে পদ্মায় আর সেতু নির্মাণের সুযোগ দেখি না।’
এদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এলাকায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় রেলসংযোগ অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে সেতু বিভাগের কাছে চিঠি দিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন আগামীর সময়কে জানালেন, পদ্মা সেতু যখনই হোক, মন্ত্রণালয় চায় তাতে রেললাইন যুক্ত হোক। এতে ভবিষ্যতে রেলপথ আরও এগিয়ে নেওয়া যাবে। বর্তমান সরকার রেললাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগও নিচ্ছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
পদ্মা নদীর ওপর প্রথম বড় সেতু হিসেবে নির্মাণ হয় লালন শাহ সেতু। ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতু ২০০৪ সালের ১৮ মে উদ্বোধন করা হয়। এরপর ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধন করা হয় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে নির্মিত পদ্মা সেতু। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও নড়াইলের একাংশ এবং যশোরের সড়ক যোগাযোগ
সহজ ও দূরত্ব কমার সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেতুতে রেললাইন যুক্ত করা হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।



