পুতিন-ট্রাম্পের ডিজেল চুক্তিতে কী আছে

ফাইল ছবি
রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং রাশিয়া-ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টা জোরদার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাকচালক ও কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ০.৫ শতাংশ কমেছে।
রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহে কতটা প্রভাব পড়বে?
ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এর পরিমাণ প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, শুধু দেশটির পরিবহন খাতেই প্রতিদিন প্রায় ২৯ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ রাশিয়ার প্রাথমিক সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন খাতের এক দিনের চাহিদারও কম।
ট্রাম্প বলেন, নভেম্বরে রাশিয়া আরও পাঁচ লাখ টন এবং ‘এর পরপরই’ আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এই দুই চালান মিলিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন খাতের চার দিনেরও কম চাহিদা পূরণ হবে।
কী কী বাধা আসতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। তবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অনেক ট্যাংকারের মধ্যে কোনগুলো জ্বালানি পরিবহনে ব্যবহার করা যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া সাম্প্রতিক ইউক্রেনীয় হামলায় রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কতটা ডিজেল রপ্তানি করতে পারে রাশিয়া?
২০২৪ সালে রুশ শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা শুরুর আগে রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় এক লাখ টন ডিজেল রপ্তানি করতে পারত।
শোধনাগারগুলোর ক্ষয়ক্ষতির কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে জুলাই থেকে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করে রাশিয়া। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নেই—এমন দেশগুলোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোসহ ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ রাষ্ট্রগুলোতে নিয়মিত রপ্তানি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
শিল্প খাতের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইউক্রেন রুশ শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ করলে ট্রাম্পের প্রাথমিক চাহিদা অনুযায়ী তিন লাখ টন ডিজেল রপ্তানি করতে পারবে রাশিয়া।
সূত্রগুলোর মতে, ইউরোপীয় অংশে অবস্থিত রাশিয়ার একটি বড় তেল শোধনাগার, যেটিতে ড্রোন হামলা হয়েছিল, সেটি আবার চালু করা গেলে চলতি মাসেই তিন লাখ টন ডিজেল উৎপাদন করতে পারবে দেশটি।
আরও ডিজেল রপ্তানিতে রাশিয়ার অর্থনীতি কতটা লাভবান হবে?
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতে, ইউক্রেনের তেল শোধনাগারগুলোতে হামলার কারণে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৬৬০ কোটি ডলার।
তিন লাখ টন ডিজেল রপ্তানি করে রাশিয়া প্রায় ৪০ কোটি ডলার আয় করতে পারে। এর সামান্য অংশই দেশটির সরকারি কোষাগারে যাবে। কারণ, রাশিয়া মূলত তেল উৎপাদনের ওপর কর আরোপ করে, তেল ও জ্বালানি রপ্তানির ওপর নয়।
রাশিয়ায় প্রায় ৩০টি বড় তেল শোধনাগার রয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনে বর্তমানে কোনো শোধনাগারই চালু নেই।
ট্রাম্পের ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া কী?
মস্কো শনিবার জানিয়েছে, জুলাই থেকে কার্যকর থাকা ডিজেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তাৎক্ষণিকভাবে আংশিক শিথিল করা হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের ডিজেল সরবরাহ চুক্তি মস্কোকে ইউক্রেনে আরও হামলা চালাতে উৎসাহিত করবে এবং এতে আরও মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারাও এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি ডন বেকন বলেন, সম্প্রতি কংগ্রেসে পাস হওয়া আরও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সময় এসেছে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার নয়।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করবে তার দেশ। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের প্রতি বার্লিনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর আগে ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে রাশিয়ার ওপর আরও চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান ওয়াডেফুল।
ক্রেমলিন সোমবার জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে এই আলোচনা শুধু তেল শোধনাগারগুলোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা।
ডিজেলের বাজারে চীনের প্রভাব
রয়টার্স জানিয়েছে, গোল্ডেন উইক ছুটির সময় সাময়িক বিরতির পর পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি আবার শুরু করতে যাচ্ছে চীন।
তবে অক্টোবরে দেশটির অনুমোদিত ডিজেল, পেট্রল ও জেট জ্বালানি রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩৭ লাখ মেট্রিক টন। এক বছর আগের তুলনায় এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এমনকি সেপ্টেম্বরে অনুমোদিত ৪০ লাখ টনেরও বেশি রপ্তানির চেয়ে তা কম।
ডিজেলের সরবরাহে এত সংকট কেন?
রাশিয়ার রপ্তানিসংক্রান্ত জটিলতার পাশাপাশি ইরানের যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি জি-৭ গোষ্ঠীর দেশগুলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সমন্বয়ে কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়তে সম্মত হয়েছে।
৩২টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত আইইএ গত মার্চে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জরুরি মজুত ছাড়ের উদ্যোগ সমন্বয় করে। সে সময় অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি মিলিয়ে ৪০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি বাজারে ছাড়া হয়েছিল। সম্প্রতি সংস্থাটি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে তাদের মজুত থেকে আগে ছাড়া হয়নি—এমন অবশিষ্ট জ্বালানিও বাজারে সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে।





