রাশিয়ার ডিজেল কিনবে যুক্তরাষ্ট্র, ক্ষুব্ধ জেলেনস্কি

এআই ছবি
রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনার চুক্তি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতে জড়ানোর পথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তির এ ঘোষণা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সাড়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের চাপকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তির ঘোষণায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জেলেনস্কি। তিনি চুক্তিটিকে ‘একেবারেই ভয়াবহ’ এবং ‘অন্যায্য ও অসৎ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ‘আড়ালে করা চুক্তি’ যুদ্ধক্ষেত্রে পুতিনকে আরও সুযোগ করে দেবে। এর কয়েক ঘণ্টা পর শনিবার সকালে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার হামলায় তিন শিশুসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে মস্কো দাবি করেছে, পূর্বাঞ্চলে তাদের সেনারা অগ্রসর হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে নতুন করে সংকট তৈরির আশঙ্কার মধ্যে শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পুতিনের সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তা কমাতে এ চুক্তি জরুরি।
ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি এইমাত্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে অত্যন্ত সফল একটি আলোচনা শেষ করেছি।’ চুক্তির আওতায় আগামী কয়েক মাসে কয়েক মিলিয়ন টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও লেখেন, ‘আমেরিকানদের জন্য, এমনকি গোটা বিশ্বের জন্যও ডিজেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে এবং দ্রুত কমতে চলেছে! আমেরিকানদের, বিশেষ করে আমাদের মহান কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য দাম কমানোই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সরু জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ক্ষতি ডেকে এনেছে। গত মাসে ডিজেলের দাম রেকর্ড ৬ দশমিক ৫২ ডলারে পৌঁছেছিল। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এ পরিস্থিতি তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
সরবরাহব্যবস্থায় ডিজেল প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর দাম বাড়লে ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দামও বেড়ে যায়। এ ছাড়া যন্ত্রপাতি চালাতে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল মার্কিন কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ডেমোক্র্যাটরা এ চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি, গত মাসে ট্রাম্পের সই করা একটি আইনের সঙ্গে এই চুক্তি সাংঘর্ষিক। ওই আইনে রাশিয়ার ব্যাংক, কর্মকর্তা ও তেলবাহী জাহাজের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে শীর্ষ পাঁচ দেশের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে আইনের বিধান থেকে ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার, পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য সিনেটর জিন শাহিন এবং ব্যাংকিং কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘ব্যর্থতা দেখতে এমনই হয়। আমেরিকানদের ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যর্থতা। শত্রুপক্ষের হাত থেকে আমেরিকাকে রক্ষা করতে তার ব্যর্থতা।’
কয়েকজন রিপাবলিকানও চুক্তির সমালোচনা করেছেন।
নেব্রাস্কার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ডন বেকন এক্সে লেখেন, ‘পুতিনের যুদ্ধ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা নৈতিকভাবে ভুল। কারণ তিনি ওই অর্থ দিয়ে শহরগুলোতে বোমা হামলা চালাচ্ছেন।’ তিনি আরও লেখেন, ‘রাশিয়া ও ইউক্রেন নিয়ে প্রেসিডেন্টের নীতিগুলো ব্যর্থ। আমাদের নৈতিক অবস্থানে স্পষ্টতা দরকার, নৈতিক অস্পষ্টতা নয়।’
তবে সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে জেলেনস্কির কাছ থেকে। অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চুক্তিটি ‘পুতিনের জন্য জন্মদিনের আনন্দের উপহার বলে মনে হচ্ছে। এটি একেবারেই ভয়াবহ।’ চলতি সপ্তাহের শুরুতে রুশ নেতার ৭৪তম জন্মদিন ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনে থাকা জেলেনস্কি বলেন, এই চুক্তি এমন একটি যুদ্ধে ‘বিনিয়োগের শামিল, যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত নয়, বরং শেষ করা উচিত’। রাশিয়া এর প্রতিদান দেবে ‘আরও সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতার’ মাধ্যমে।
তিনি বলেন, ‘এটি রাশিয়ার স্বার্থেই কাজ করছে। এর ফলে তারা আরও বেশি মানুষ হত্যা করতে পারবে, আরও দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালাতে পারবে, আমেরিকার প্রতি আরও কম শ্রদ্ধা দেখাবে এবং বিশ্ব জুড়ে আরও বেশি ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংস ডেকে আনবে।’
এদিকে রুশ গণমাধ্যম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলের লুকাশোভে ও লোবানিভকা বসতি দখল করেছে রুশ বাহিনী।
এর আগে জেলেনস্কি বলেছিলেন, পুতিন ট্রাম্পের সঙ্গে কৌশলী খেলা খেলছেন। শনিবার ক্রেমলিনের এক মুখপাত্র জানান, সংঘাত প্রশমনে ট্রাম্পের প্রস্তাবগুলোকে পুতিন ‘বোঝাপড়ার সঙ্গে’ গ্রহণ করেছেন।
ট্রাম্পের এ জ্বালানি চুক্তির ঘোষণা এমন একসময়ে এলো, যখন তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মায়ামিতে বৈঠক করছিলেন।
সম্প্রতি রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। জেলেনস্কিকে বিকল্প লক্ষ্যবস্তু বেছে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। তবে জেলেনস্কি এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার শর্ত, রাশিয়াকে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা কমানোর এমন একটি পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে, যার আওতায় মস্কো ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করবে।
চুক্তিটি এমন একসময়ে হলো, যখন রাশিয়া ও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। মস্কো ন্যাটো জোটের দৃঢ়তা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান




