ডিজেল নিয়ে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ

ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সরবরাহে টান পড়েছে। সংকট সামাল দিতে ইউরোপের জরুরি মজুদ থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ছাড়তে চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। দাবি না মানলে রপ্তানি বন্ধের হুমকিও দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন একতরফা চাপ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আর এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিটারপ্রতি ২ পাউন্ড ছাড়িয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের জরুরি জ্বালানি মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের বড় দেশগুলোকে ২০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। দাবি পূরণ না হলে যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা।
তবে মার্কিন এই হুমকিতে সায় নেই ইউরোপের। ব্রাসেলসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র আন্না-কাইসা ইতকোনেন বলেছেন, ‘কোনো নিষেধাজ্ঞাই কারও জন্য উপকারী হবে না। এটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের আস্থা দুর্বল করবে।’
ইউরোপীয় কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট— জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি মজুদ ছাড়ার প্রয়োজন হলে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) কাঠামোর আওতায়, সমন্বিতভাবে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কারণ, সদস্য দেশগুলোর জরুরি জ্বালানি মজুদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত কমিশন এককভাবে নেয় না।
অবশ্য ইউরোপের এই অনড় অবস্থানের মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে ইউরোপীয় দেশগুলো। আলোচনায় সদস্য দেশগুলো প্রস্তাব দিয়েছে, অতিরিক্ত মজুদ ছাড়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
সংকটের সমাধানে ফ্রান্সের প্রস্তাব, ইউরোপের জরুরি ভান্ডার থেকে ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়া হোক। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো আরও ৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছাড়তে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জরুরি ডিজেল ও গ্যাস অয়েল মজুদের প্রায় ১৭ শতাংশ এই ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল। তবে পরিমাণটি ইউরোপের বার্ষিক ব্যবহারের মাত্র ৩ শতাংশের সমান।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা এর দ্বিগুণ। ট্রাম্প প্রশাসন চায়, ইউরোপ ২০ দিনের মধ্যে জরুরি মজুদ থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ছাড়ুক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিদেশে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করার কথা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই এমন অবস্থান নিয়েছে তার প্রশাসন। বিশেষ করে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ এখন ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে জ্বালানি সংকট নিয়ে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা জোরদার করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। যুক্তরাষ্ট্রসহ জি৭ দেশগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরে জি৭ নেতাদের ভিডিও বৈঠকও ডাকেন মাখোঁ। এর আগে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে জ্বালানির দাম কমাতে সহযোগিতার পাশাপাশি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ না করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই সংকটের গভীরতা বাড়াচ্ছে একের পর এক ধাক্কা। ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ইউক্রেনের হামলায় একাধিক শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাশিয়াও ডিজেল রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ মজুদ বাড়াতে অক্টোবরে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করেছে চীন। ফলে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে প্রতিযোগিতা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে যুক্তরাজ্য। স্কাই নিউজের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ব্যবহৃত ডিজেলের প্রায় ৫৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ফলে মার্কিন রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে ব্রিটেনকে। আর সংকটের এই সময়ে বিকল্প সরবরাহের জন্য অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামার অর্থ আরও বেশি দামে ডিজেল কেনা।
এদিকে, গতকাল ২ অক্টোবরের আলজাজিরার লাইভ প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বরাতে ইউরোপের বিপুল পরিমাণ ডিজেল ছাড়তে সম্মত হওয়ার দাবিও প্রকাশিত হয়েছে। তবে একই প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মার্কিন দাবিকে ‘সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান’ করার অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে জরুরি মজুদ ছাড়ার বিষয়ে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট।



