নিরাপত্তায় আমেরিকা, অর্থনীতিতে চিন: দুই শক্তির মাঝে ভারসাম্যের খেলায় জর্ডান

ইরান যুদ্ধের আঁচে নতুন হিসাব, সম্পর্ক গভীর করতে চীনে জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ
নিরাপত্তার প্রশ্নে এখনও ওয়াশিংটনই সবচেয়ে বড় ভরসা। বছরে বিপুল মার্কিন সহায়তাও পায় দেশটি। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, ততই অন্য একটি দরজাও খুলে রাখতে চাইছে জর্ডান৷ সেই দরজা বেইজিংয়ের। ১৮ থেকে ২৪ আগস্ট সাত দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে গিয়েছেন জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। এক দশকেরও বেশি সময় পর তার এই রাষ্ট্রীয় সফরকে তাই শুধু বাণিজ্য বা বিনিয়োগের হিসাব বলে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। ইরান যুদ্ধ, ইসরায়েলের আঞ্চলিক নীতি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে জর্ডান যেন একটিমাত্র শক্তির উপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে চাইছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আম্মান ওয়াশিংটন ছেড়ে বেইজিংয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। বরং সমীকরণটি আরও সূক্ষ্ম, নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে রাখা, আর অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মার্কিন গণমাধ্যম আল-মনিটরের বিশ্লেষণে একে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ‘পুনঃসমন্বয়’-এর অংশ বলা হয়েছে। মিশর ইতিমধ্যেই চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোও বেইজিংয়ের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক চুক্তিতে আগ্রহী। সেই পথেই এ বার আরও সক্রিয় জর্ডান।
রাজা আবদুল্লাহর সফর শুরু হয় সাংহাই থেকে। সেখানে ওষুধ, খাদ্য, প্রকৌশল, কৃষি ও বিমান চলাচল খাতের শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। জর্ডানের রাজপ্রাসাদের তথ্য অনুযায়ী, চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যে দক্ষতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ নিয়েই মূল আলোচনা হয়েছে। আবদুল্লাহ জর্ডানের দক্ষ জনশক্তি, উন্নত ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও অন্য বাজারে প্রবেশের জন্য দেশটির কৌশলগত অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন।
সাংহাইয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় পর্যটন সংস্থা ট্রিপ ডটকমের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন রাজা। লক্ষ্য, জর্ডানে আরও বেশি চীনা পর্যটক টানা এবং দুই দেশের মধ্যে বিমান যোগাযোগ বাড়ানো। পরে চীনের প্রযুক্তি ও শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র শেনঝেনে কমিউনিস্ট পার্টির স্থানীয় প্রধান জিন লেইয়ের সঙ্গে বৈঠকে নতুন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এবং চীনের আইনসভার শীর্ষ নেতা ঝাও লেজির সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে। সফরের মধ্যেই দুই দেশের একাধিক সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা।
রাজা হওয়ার পর এটি আবদুল্লাহর নবম চীন সফর, তবে ২০১৫ সালের পর প্রথম। সেই ২০১৫ সালেই জর্ডান ও চীন ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ গড়ে তোলে। আগামী বছর আবার দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্ণ হবে। সফরের আগে চীনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আবদুল্লাহ চীনকে বিশ্বের ‘অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার কথায়, গত এক দশকে বাণিজ্য-বিনিয়োগ ছাড়িয়ে দুই দেশের সহযোগিতা অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিতেও ছড়িয়েছে।
অর্থনীতিই এখন বড় তাগিদ
জর্ডানের কাছে চীনকে প্রয়োজন হওয়ার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক কারণ অর্থনীতি। দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাতে পর্যটন, জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিমান চলাচলে চাপ বেড়েছে। পর্যটন থেকেই জর্ডানের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে। যুদ্ধের ধাক্কায় সেই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
দুই দেশের বাণিজ্য ইতিমধ্যেই বড়। ২০২৫ সালে চীন-জর্ডান বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার ছুঁয়েছে। কিন্তু হিসাবটি জর্ডানের পক্ষে নয়, চীন জর্ডানে প্রায় ৬২৯ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে, বিপরীতে জর্ডানের চীনে রফতানি ছিল মাত্র প্রায় ৪৩ কোটি ডলার। তাই শুধু আরও চীনা পণ্য কেনা নয়, চীনের কারখানা, প্রযুক্তি ও উৎপাদনক্ষমতাকে জর্ডানে নিয়ে আসাই এখন আম্মানের লক্ষ্য। চীনা বিনিয়োগ ইতিমধ্যে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি বলে জর্ডানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন।
জর্ডানের দীর্ঘমেয়াদি ‘ইকোনমিক মডার্নাইজেশন ভিশন’-এ ২০৩৩ সালের মধ্যে অন্তত ১০ লাখ নতুন তরুণকে কর্মবাজারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সেখানে চীনা শিল্প ও প্রযুক্তি বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে আশা আম্মানের। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের ইউইজি গ্রিন হাইড্রোজেন ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে প্রায় ১১৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সবুজ হাইড্রোজেন প্রকল্প নিয়ে সমীক্ষা চুক্তিও করেছে জর্ডান। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় দুই লাখ টন সবুজ অ্যামোনিয়া উৎপাদন করে রফতানি করা সম্ভব হবে।
তবু আমেরিকাকে ছাড়া সম্ভব নয়
চীনের দিকে এই ঝোঁকেরও স্পষ্ট সীমা রয়েছে। জর্ডানের প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার কেন্দ্রে এখনও যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালেই জর্ডানের জন্য প্রায় ২১০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক, সামরিক ও বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সামরিক সহযোগিতা জর্ডানের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কাজেই বেইজিং সফরকে ‘আমেরিকার বদলে চীনকে বেছে নেওয়া’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে ভবিষ্যৎ নিয়ে। আম্মানভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক টেলর লাকের মতে, এক সপ্তাহের এই সফরের সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার বিশ্লেষণ, বর্তমান গভীর আঞ্চলিক সংকটের মধ্যে এত দীর্ঘ চীন সফর দেখাচ্ছে, একটি মাত্র অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে জর্ডানের জন্য নিরাপদ নয় বলে বুঝতে শুরু করেছে আম্মান। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ভাবনা আরও শক্তিশালী হলে বর্তমান মাত্রার সহায়তা ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েলের আঞ্চলিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ। যুদ্ধ কত দিন চলবে, হরমুজকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানিপথ কী ভাবে বদলাবে, কিংবা হোয়াইট হাউস ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের প্রতি কতটা ধারাবাহিক থাকবে, তার কোনওটিরই নিশ্চিত উত্তর নেই। তাই জর্ডানের লক্ষ্য এমন বিকল্প বাণিজ্য ও সরবরাহপথ খোঁজা, যা নতুন মধ্যপ্রাচ্যে দেশটিকে আরও স্বাধীন ভাবে চলার সুযোগ দেবে।
রাজা আবদুল্লাহ নিজেও চীনের আন্তর্জাতিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। সিনহুয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ‘ন্যায্য বিশ্বব্যবস্থা’র পক্ষে চীনের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এগিয়ে নিতেও বেইজিংয়ের ভূমিকা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
ফলে আবদুল্লাহর এই সাত দিনের সফরের বার্তা শুধু কয়েকটি বিনিয়োগ চুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। জর্ডান আমেরিকাকে হারাতে চায় না, কিন্তু আমেরিকার উপর একমাত্র ভরসা করেও থাকতে চাইছে না। নিরাপত্তার ছাতা আপাতত ওয়াশিংটনেরই; কিন্তু শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বেইজিংয়ের দরজাও যতটা সম্ভব খুলে রাখতে চাইছে আম্মান। মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে থাকলে জর্ডানের এই ‘দুই দিক খোলা’ কৌশলই হয়তো আরও অনেক মার্কিন মিত্রের পথ হয়ে উঠতে পারে।






