নথিতে পাকা সড়ক, বাস্তবে কাঁচা, বরাদ্দের ৩৩ লাখ টাকা গেল কোথায়?

ছবি: আগামীর সময়
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারী বাড়ি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক এলজিইডির নথিতে পিচঢালা পাকা হিসেবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সড়কটি এখনো কাঁচা। শুধু তাই নয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সড়কটির সংস্কারের জন্য ৩৩ লাখ ৮ হাজার ৮৮৫ টাকা বরাদ্দ দিয়ে কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত সড়কে কাজ না করে ওই বরাদ্দের অর্থে অন্য একটি সড়কে কাজ করা হয়েছে।
এলজিইডির নথি অনুযায়ী, বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারী বাড়ি পর্যন্ত সড়কটির আইডি নম্বর ৫৭৮৫২৫১৩৩। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি পাকাকরণের তথ্য রয়েছে। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিওবি-এম প্রকল্পের আওতায় একই সড়কের সংস্কারের জন্য ৩৩ লাখ ৮ হাজার ৮৮৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজটি পায় মেসার্স একতা এন্টারপ্রাইজ।
নথিতে দেখা যায়, গত ২৩ মার্চ কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। এরপর ২৭ এপ্রিল ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বরাদ্দ পাওয়া সড়কটিতে বাস্তবে কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। তাদের অভিযোগ, একই ইউনিয়নের ‘চাঁনমিয়া সিকদার সড়ক’-এ ওই বরাদ্দের অর্থে কাজ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ‘চাঁনমিয়া সিকদার সড়ক’-এর কোনো অনুমোদন বা এলজিইডির আইডি নম্বর নেই। এমনকি সাবেক এক বিচারপতির এক আত্মীয়ের বাড়ির সামনের সড়কে সরকারি বরাদ্দের অর্থে কাজ করার অভিযোগও উঠেছে। ফলে নির্ধারিত প্রকল্পের বাইরে গিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঠিকাদার মো. মাসুদ রানা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, এসও ও উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশনা অনুযায়ী শিডিউল মেনেই শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করেছেন। কাজ শেষে নিয়ম অনুযায়ী বিল উত্তোলন করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
কাজটির তদারক কর্মকর্তা উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী মো. লুৎফর রহমানও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, ২০১০-১১ অর্থবছরের যে সড়কটির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সেখানেই কাজ হয়েছে। তবে বরাদ্দ অন্যত্র ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভুল তো আগেই হয়েছে, আমার কিছু করার নাই।’
এদিকে বিষয়টি নিয়ে বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী এটিএম সাদিকুর রহমান বলেন, একটি প্রকল্পের বরাদ্দ দিয়ে আইডিবিহীন অন্য কোনো সড়কে কাজ করার সুযোগ নেই। অভিযোগটি খতিয়ে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
তবে এ বিষয়ে সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী মকবুল হোসেন ও হিসাবরক্ষক মো. চাঁন মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ওয়ালিয়ার রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
নথিতে সড়কটি পাকা, সংস্কারকাজ শেষ এবং সরকারি অর্থের চূড়ান্ত বিল পরিশোধ হয়ে গেলেও সরেজমিনে সড়কটি কাঁচা থাকার ঘটনায় প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি বরাদ্দ নির্ধারিত সড়কেই ব্যয় হয়েছে কি না এবং কাজের নামে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।




