গণমাধ্যমে ছবি-ভিডিও প্রকাশে লাগবে বন্দরের অনুমতি!

ছবি: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল তথ্য, ছবি, ভিডিও প্রচার ও প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকেও কঠোর ও নজিরবিহীন সতর্কবার্তা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা সংরক্ষিত এলাকা ও অপারেশনাল তথ্য, স্কেচ, অবকাঠামোর ছবি-ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ না করার নির্দেশনা দিয়ে আজ মঙ্গলবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।
বিজ্ঞপ্তিতে সামাজিকমাধ্যম, অনলাইন প্লাটফর্ম ও গণমাধ্যমের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে কঠোর সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের ধারা উল্লেখ করে দণ্ডের বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের বার্তা সম্পাদক ও ব্যুরোপ্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর পর থেকেই নেপথ্যের কারণ খোঁজা শুরু হয়েছে হঠাৎ কেন এই বিজ্ঞপ্তি।
এমন একসময়ে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা এলো যখন চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়া নিয়ে আন্দোলন জমে উঠেছে। ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের এজেন্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের প্রকাশ্যে সমাবেশে পদত্যাগ দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে ১৩ অক্টোবর বন্দর চেয়ারম্যান কার্যালয় ঘেরাও করে তাকে অফিস থেকে বের হতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি এসেছে।
এমন একসময়ে বিজ্ঞপ্তি এলো যখন বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার এত নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে কনটেইনার গায়েব হয়ে যাচ্ছে। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে পণ্যভর্তি কনটেইনার গেট দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। আর ছবি তোলার যে কঠোরতা দেখানো হচ্ছে, বন্দরের পাশ দিয়ে যাওয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ওপর থেকে সহজেই সব ধারণ করা যাচ্ছে। আর সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান এক ভ্লগারকে ডেকে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের সামনে যে ইন্টারভিউ দিয়েছেন সেখানেও তো সব ছবি-ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ জানালেন, ‘বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের সিকিউরিটি নিয়ে যেখানে উদ্বিগ্নরা আন্দোলন করছে, সোচ্চার হচ্ছে, সেখানে নিউজ করলে বন্দরের নিরাপত্তা লঙ্ঘিত হওয়ার যুক্তি দ্বিচারিতা। সাংবাদিকরা দেশের প্রচলিত আইন-নীতি মেনেই সংবাদ প্রকাশ করছে। এটা গণমাধ্যমকে আটকানোর কৌশল। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
এবিষয়ে জানতে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে ফোন দিলে সাড়া মেলেনি। বন্দর সচিব ও মুখপাত্র সৈয়দ রেফায়েত হামিমকে ফোন দিলেও তিনি সাড়া দেননি।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বাক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বন্দর তার আইন অনুযায়ীই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু নিরাপত্তা বিঘ্নিতের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার নামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করছে কিনা দেখতে হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তির বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশের ভয় পাচ্ছে কি না বন্দর। আর বিদেশি লুটেরাদের ইজারা দেওয়ার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জনমত স্তব্দ করার চেষ্টা বন্দরের আছে কি না সেটিও জানতে হবে।
তার ভাষ্য, সরকারের উচিত এমন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করা, যেখানে জনগণের সম্পদের মালিকানা জনগণই বুঝে নেওয়ার তথ্য থাকবে।
বিজ্ঞপ্তির পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বন্দর বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় অর্থনীতি, আমদানি-রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও জাতীয় নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করে বন্দর পরিচালিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আইএসপিএস কোড অনুসরণকারী বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর 'জিরো অবজারভেশন' অর্জন করেছে। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ 'ক' শ্রেণির কেপিআই হিসেবে বন্দরের নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সংবেদনশীল স্থাপনার সুরক্ষা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
অননুমোদিত তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের মাধ্যমে বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন, নিরাপত্তা বিধিমালা ও বন্দরের প্রচলিত নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি এসেছে বিজ্ঞপ্তিতে।
বিজ্ঞপ্তিতে নির্দেশনা জারির নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। 'সংবেদনশীল স্থাপনা' বলতে কী কী বোঝানো হয়েছে, তারও কোনো তালিকা বা সংজ্ঞা নেই। জাহাজ, জেটি বা কনটেইনার ইয়ার্ডের সাধারণ ছবি-ভিডিও এর আওতায় পড়বে কি না এবং অনুমতি কোন দপ্তর থেকে, কীভাবে নিতে হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।
বন্দরের এক কর্মকর্তা বলছেন, সম্প্রতি অনেক ব্যক্তি নিজের ফেসবুক পেজে বন্দর জেটির ছবি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। আজ বন্দরের এক জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য নামানোর সময় হুক ছেঁড়ার ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সংবাদকর্মীরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের কথা বলে গণমাধ্যমকেও এই কাতারে ফেলে সতর্ক করে দেওয়া বন্দরের চরম বোকামি। এটি হিতে বিপরীত হবে।





