একটি অনুসন্ধান
রোগীর কেনা ওষুধ অপারেশন থিয়েটার থেকে যেভাবে ফেরে ফার্মেসিতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটা লম্বা ফর্দ ধরিয়ে দেওয়া হয়— অপারেশনের দিন। বলা হয়, ওষুধগুলো ওটিতে নেওয়ার আগেই লাগবে। রোগীর স্বজন পড়িমরি করে ছুটে যান আশপাশের ফার্মেসিতে। কখনো ওষুধ আনানো হয় দফায় দফায়। কিন্তু রোগীর স্বজনদের কেনা সেই ওষুধের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত যাচ্ছে কোথায়?
রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অনুসন্ধান চালিয়ে এমন কিছু দৃশ্য ও ভিডিও পেয়েছে আগামীর সময়, যেখানে রোগীর স্বজনদের কেনা ওষুধ হাসপাতাল থেকে বাইরে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। কোথাও নার্স, কোথাও ওয়ার্ডবয় ও অন্য কর্মীর মাধ্যমে এসব ওষুধ বাইরের ফার্মেসিতে পৌঁছে যাচ্ছে। বিনিময়ে টাকা নেওয়ার দৃশ্যও ধরা পড়েছে প্রতিবেদকের ক্যামেরায়।
গত ১৫ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে স্বজনদের ওষুধ কেনা ও সরবরাহের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
১৬ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টা। কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব ১-এর ২৪৪ নম্বর কক্ষ। দুই পাতার ট্যাবলেট নিয়ে সেখানে ঢোকেন ওয়ার্ডবয় বাবুল মোল্লা। কিছুক্ষণপর পোশাক বদলে কালো ব্যাগ নিয়ে বের হন তিনি। হাসপাতালের মূল ফটক পেরিয়ে সামনের বিসমিল্লাহ ফার্মেসিতে যান। ওষুধের ব্যাগটি সেখানে রেখে চলে যান তিনি।
পরদিন ১৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৭টা। ক্যাথল্যাব থেকে বের হন নার্স আনজুমান আরা। হাসপাতালেরই প্রশাসনিক ভবনের অন্তরা ফার্মেসিতে গিয়ে কিছু ওষুধ আর একটি কাগজ দেন। কিছুক্ষণ পর ফার্মেসির ভেতর থেকে তার হাতে একমুঠো টাকা দেওয়া হয়। টাকা ব্যাগে পুড়ে তিনি ক্যাথল্যাবে ফিরে যান।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে ক্যাথল্যাব থেকে বের হন আরও তিন নার্স। তাদের একজন সালেহার হাতে ছিল তিনটি ব্যাগ। হাসপাতালের মূল ফটক পেরিয়ে তিনি দক্ষিণ দিকের সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে হাঁটতে থাকেন। প্রায় ২০০ মিটার দূরে এক ব্যক্তির হাতে ব্যাগগুলো তুলে দেন তিনি। ওই ব্যক্তি রিকশায় করে মোহাম্মদপুরের দিকে রওনা হন। প্রায় ১৫ মিনিট অনুসরণ করেন প্রতিবেদক। পরে রিকশাটি মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজার রোডের ৪/৮ নম্বর বাড়ির রাজবাড়ী টেইলার্সের সামনে থামে। বাড়ির দারোয়ান মাজেদ মিয়া জানালেন, রিকশাচালক নিয়মিত সেখানে আসেন এবং ওষুধের ব্যাগ নিয়ে দোতলার রুহুল নামে এক ব্যক্তির কাছে দেন। তার দাবি, ওই ব্যক্তি বিভিন্ন ফার্মেসিতে ওষুধ সরবরাহ করেন। অভিযোগের বিষয়ে সালেহা জানালেন, তিনি মোহাম্মদপুরের রুহুল আমীনের কাছে ওষুধ দিতেন। কিছুদিন ধরে তিনি এ কাজ করছেন— প্রতিবেদকের কাছে তা স্বীকার করেন।
ক্যাথল্যাব ২-এও পাওয়া গেছে একই ধরনের অভিযোগ। ৮ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা ২০ মিনিটে নার্স সাইফুন্নাহার ও তন্নীকে দুই ব্যাগ নিয়ে ক্যাথল্যাব থেকে বের হতে দেখা যায়। পরে তারা হাসপাতালের প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে উত্তর দিকের কিডনি হাসপাতালের দিকে যান। সাইফুন্নাহার ফোন করার পর এক ব্যক্তি বের হয়ে আসেন। দুজন একসঙ্গে রাস্তা পার হয়ে আগন্তুকের হাতে একটি ওষুধের ব্যাগ তুলে দেন। ওই ব্যক্তি ব্যাগ নিয়ে রাস্তার উল্টো পাশের অনুরাগ ফার্মেসিতে ঢোকেন। কিছুক্ষণ পর ফার্মেসির কর্মী রাসেল সাইফুন্নাহারের হাতে একমুঠো টাকা দেন। পরে হাসপাতালের কর্মী শান্তাও ওই ফার্মেসিতে যান। তার হাতেও টাকা দেওয়া হয়।
সাইফুন্নাহার অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তিনি হাসপাতালের ওষুধ বিক্রি করেননি। তার দাবি, অসুস্থ স্বামীর অব্যবহৃত ওষুধ ফেরত দিতেই ওই ফার্মেসিতে গিয়েছিলেন। তবে প্রতিবেদকের কাছে থাকা ভিডিওর কথা জানানো হলে তিনি সমঝোতার প্রস্তাব দেন।
ক্যাথল্যাব ২-এর নার্স ফাতেমার বিরুদ্ধেও ওষুধ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বললেন, ‘আপনারা যা করার করেন।’ এরপর ফোন কেটে দেন।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে বড় বোনকে নিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালে এসেছেন হাজেরা বেগম। হৃদযন্ত্রে রিং (স্টেন্ট) বসানোর জন্য ১৭ দিন ধরে হাসপাতালে ঘুরেছেন তিনি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তার বোনের অপারেশন করার কথা ছিল।
হাজেরা বেগমের ভাষ্য, অপারেশনের প্রস্তুতির সময় নার্স ও ওয়ার্ডবয় রোগীর হাতে শিরায় ক্যানুলা বা সুঁই ঢোকানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। এ সময় রোগীর স্বজনদের দিয়ে বাইরে থেকে একাধিক ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী আনা হয়। তবে পরে সেগুলো আর ব্যবহার করা হয়নি।
হাজেরার প্রশ্ন, অপারেশনের জন্য যেসব ওষুধ ও সামগ্রী প্রয়োজন, সেগুলো যদি হাসপাতালে থাকার কথা থাকে, তাহলে স্বজনদের দিয়ে বাইরে থেকে কেন কিনিয়ে আনা হলো? আর আনার পরই যদি সেগুলো ব্যবহার না করা হয়, তাহলে সেই ওষুধগুলো গেল কোথায়?
নারায়ণগঞ্জ থেকে মা খালেদা বেগমকে নিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালে এসেছেন মরিয়ম আক্তার। হৃদযন্ত্রের সমস্যায় তাকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের ১২ নম্বর নন-পেয়িং বেডে ভর্তি করা হয়। মরিয়মের ভাষ্য, তার মায়ের পা থেকে সিভিপি লাইন (সিঁথি) বের করার জন্য তাকে সিসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে ওয়ার্ডবয়ের দায়িত্বে থাকা এহসান একটি কাগজে অতিরিক্ত গ্লাভসসহ তিনটি চিকিৎসাসামগ্রীর নাম লিখে বাইরে থেকে আনতে বলেন। স্বজনরা সেগুলো কিনে আনার পরও কাজে লাগানো হয়নি বলে অভিযোগ মরিয়মের। ঘটনাটি রোগীর স্বজন সেজে প্রত্যক্ষ করেন প্রতিবেদক।
মরিয়ম জানিয়েছেন, এত তাগিদ দিয়ে বাইরে থেকে জিনিসগুলো আনা হলো, কিন্তু পরে ব্যবহারই করা হলো না। সেগুলো পরে কোথায় গেল, তা তার জানা নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এহসান তার ওপর চড়াও হন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসডিইউ বিভাগের এক ওয়ার্ডবয় জানিয়েছেন, সিভিপি খোলার জন্য রোগীর স্বজনদের দিয়ে মাইক্রোপোর ও হ্যাপারিন ইনজেকশন কেনানো হয়। তার দাবি, একটি হ্যাপারিন পাঁচজন রোগীর এবং একরোল মাইক্রোপোর ১০ জনের কাজে লাগতে পারে। কিন্তু প্রতিটি রোগীর জন্যই আলাদাভাবে এসব কিনতে বলা হয়।
ওয়ার্ডবয়ের ভাষ্য, এসডিইউ বিভাগের এ প্রক্রিয়ার হোতা হোসেন। রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি নেওয়া মাইক্রোপোর ও হ্যাপারিন পরে ঢাকা ফার্মেসিতে বিক্রি করা হয়। অর্থাৎ স্বজনদের দিয়ে যে ফার্মেসি থেকে এসব কেনানো হয়, কর্মীদের সহায়তায় অতিরিক্ত সামগ্রী আবার সেই ফার্মেসিতেই ফিরে যায়।
হৃদরোগ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সময় রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়ার কথা রয়েছে বেশ কিছু ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী। এর মধ্যে রয়েছে ইনজেকশন হার্টশোল ১০০০ মিলি, স্যালাইন, সার্জিক্যাল গ্লাভস, ডিসপোজেবল ক্যাপ, মাইক্রোপোর, ইনজেকশন পাপাভেরিন, ইনফিউশন নরমাল স্যালাইন ও সার্জিক্যাল ব্লেড। অভিযোগ রয়েছে, এসব সামগ্রী হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীর স্বজনদের বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করা হয়।
ভাসকুলার বিভাগেও রয়েছে একই ধরনের অভিযোগ। জরুরি বিভাগে কাজ করেন গিয়াসউদ্দিন। অভিযোগ, চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের স্লিপ নিয়ে তিনি হাসপাতালের অন্তরা ফার্মেসিতে যান এবং স্লিপের বিপরীতে কমিশন নেন। তার সঙ্গে ওয়ার্ডবয় মিরাজও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
পঞ্চমতলার ভাসকুলার বিভাগের ইনচার্জ রেহান জান্নাত। রোগীর অপারেশনের আগের দিন প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা দেওয়া হয়। স্বজনদের অভিযোগ, তালিকায় এমন ১০ থেকে ১২টি ওষুধও থাকে, যেগুলো হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করার কথা। এরপরও সেগুলো বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়।
স্বজনরা ওষুধ কিনে দিলে সেগুলো নিজেদের কাছে রেখে সরকারি সরবরাহের ওষুধ দিয়ে অপারেশন করা হয় বলে অভিযোগ। পরে স্বজনদের কেনা ওষুধ ঢাকা ফার্মেসিতে বিক্রি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অপারেশন থিয়েটার থেকে এসব ওষুধ বাইরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওয়ার্ডবয় জালাল ও মীমের বিরুদ্ধে।
১৫ সেপ্টেম্বর রাতে ভাসকুলার বিভাগে ব্যাগভর্তি ওষুধসহ ওয়ার্ডবয় মীমকে আনসার সদস্যরা আটক করেন। তবে পরদিনই তাকে আবার দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। কেন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে— জানতে চাইলে আনসার কমান্ডার আমিনুল ইসলাম বললেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
শুধু ওষুধ বাইরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ নয়, একই ওষুধ একাধিকবার কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। গত ১২ আগস্ট পাবনা থেকে আসা নাহিদা বেগম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তার স্বামী পরানকে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নেওয়ার আগে একই ধরনের ওষুধ দুই দফায় কিনতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি। এতে তার খরচ হয় ১২ হাজার ৮০ টাকা। তবে অভিযোগ করার এক মাস পরও এর সমাধান হয়নি বলে দাবি তার। অভিযোগের বিষয়ে তাকে পরে আর জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মুনীর আহমেদ খান বললেন, ‘আমরা তো এখানে চোর-ডাকাত পুষতে বসিনি। কেউ অপরাধ করলে শাস্তি পাবে।’ ১৫ সেপ্টেম্বর মীম ওষুধসহ ধরা পড়ার বিষয়টি তার জানা নেই জানিয়ে তিনি বললেন, ‘তবে নাহিদার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।’
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘আমি এখন বেরিয়ে যাব, কথা বলতে পারব না।’ এরপর তিনি চলে যান। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে এটিই তার এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।



