কলেজীয় ব্যবস্থা ছিনতাই করে বিশ্ববিদ্যালয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সম্মানিত উপাচার্যের এক বক্তব্য নিয়ে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেউ আরে ঠারে, কেউ প্রকাশ্যে সরকারি কলেজগুলোতে উচ্চশিক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা দিতে হলে পৃথকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দিতে বলা হচ্ছে।
আজকের তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আবির্ভাবের আগেই এ দেশে কলেজ শিক্ষার সূচনা। শুধু এ দেশে নয়, বরং পাশ্চাত্যেও। কলেজ বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি শাখা বা ইউনিট মনে করা হতো। সেখানেই শিক্ষার্থীদের পড়ানো হতো। আর এসব কলেজের শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কমিটি কাজ করত। মূলত তাকেই বিশ্ববিদ্যালয় বলা হতো। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা নিয়ে আসে। এর প্রতিফলন দেখা যায় ভারতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত কলেজীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এসব কলেজ থেকে বাংলায় নবযুগের সূচনা হয়েছে। শ্রীরামপুর কলেজ বা হিন্দু কলেজ বাংলায় বাতিঘররূপে আবির্ভূত হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করেছেন বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো যুগপুরুষরা।
আলীগড় কলেজ ও ইসলামিয়া কলেজ বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসে। এই ইসলামিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল কুদরত-ই-খুদা বাংলায় বিজ্ঞান আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। ষাট-সত্তরের দশকের উজ্জ্বলতম পুরুষরা বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান, নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদ, দার্শনিক সাইদুর রহমান, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবুল ফজল, আ ন ম বজলুল রশীদ, আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন, মঞ্জুশ্রী রায়চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কবীর চৌধুরী প্রমুখ। তখন কিন্তু কলেজের শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি।
শূন্য দশকের পর যখন সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়ে গেল, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠল সহজ কর্মসংস্থানের উপায়, তখনই কলেজীয় শিক্ষাব্যবস্থা আক্রান্ত হতে শুরু করল। ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের মাধ্যমে সে যাত্রার সূচনা। পরে দেশের একমাত্র সরকারি আর্ট কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। দেখা গেল একই প্রতিষ্ঠান একই অবকাঠামো একই উৎস থেকে অর্থের আগমন; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক সংখ্যা ও অর্থ বরাদ্দে আমূল পরিবর্তন এলো। ফলে কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরে ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠল।
একটি ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় কীভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, তার একটা চিত্র হয়তো পাঠক পেয়েছেন। কিন্তু এর জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কতটা দায়ী
পুরো বিষয়টির সঙ্গে বিনিয়োগের একটা সম্পর্ক আছে। বিশ্ববিদ্যালয় হলে প্রাতিষ্ঠানিক আয় যে বাড়ে এমন নয়, বরং সরকার উদার হস্তে বরাদ্দ দিতে থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অধিক সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে।
সাধারণ সরকারি কলেজের শিক্ষার মান নিয়ে পণ্ডিত মহলে উদ্বেগ দেখা গেলেও সরকারি মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার মান নিয়ে কিন্তু তাদের কোনো উদ্বেগ নেই। সেখানে কিন্তু সরকারি কলেজের মতো সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানেও যে গবেষণার খুব একটা সুযোগ আছে, তা কিন্তু নয়; বরং মৌলিক বিষয়ের শিক্ষক সংকট তীব্র। তারপরও এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা পরবর্তী জীবনে ভালো রোজগারি হয়ে ওঠে।
১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধ্যাদেশের আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজগুলোর চাকরি অধিক আকর্ষণীয় ছিল। কারণ, সরকারি কলেজে পেনশন থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ছিল না। কিন্তু একটি অধ্যাদেশের পর চিত্র রাতারাতি বদলে যেতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদক্রমে উন্নয়ন ঘটে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে ১ নম্বর বেতন গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু কলেজের শিক্ষকরা ৪ নম্বর গ্রেডের পর আর যেতে পারেন না।
গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা চালানোর কোনো নীতি ও অবকাঠামোগত সুযোগ আসলে কলেজগুলোতে নেই; বরং সক্ষমতার বহু গুণ বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে কলেজগুলোকে একটা হাটবাজারে রূপান্তর করা হয়েছে। কলেজগুলোর এই ছাত্রভর্তি ও পাঠদানের গুণগতমান দেখার জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সেখানে ঊর্ধ্বতন পদে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বসেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এর দায় এড়াতে পারেন না।
একটি ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় কীভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, তার একটা চিত্র হয়তো পাঠক পেয়েছেন। কিন্তু এর জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কতটা দায়ী? শিক্ষক প্রতিস্থাপনও বা কি এর সমাধান হতে পারে?
বাংলাদেশের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে সরকারি কলেজের নিয়োগ প্রক্রিয়া। সবচেয়ে কম প্রশ্ন উঠেছে এ প্রক্রিয়া নিয়ে। তাই এ প্রক্রিয়ায় যে মেধাবীরা আসছে না, সেটি বলা একধরনের বাতুলতা ছাড়া কিছু নয়; বরং অন্য অনেক জায়গার ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগে বঞ্চিতরা একসময় বাধ্য হয়ে এসব কলেজে চাকরি নেন। স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার পর পুরো একটা অস্বচ্ছ কর্মজীবন তার জন্য অপেক্ষা করে। নিয়োগে মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকার পর নিয়োগ হয় উপজেলা পর্যায়ের কোনো কলেজে। অথচ পেছনের কাতারের কেউ পেয়ে যান ঢাকার শীর্ষ কলেজগুলোতে পদায়ন। কলেজে গবেষণা ও পড়াশোনার চেয়ে বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজকে উৎসাহিত করা হয়। কিছু জ্ঞানপিপাসু শিক্ষক গবেষণা করেন, লেখালেখি করেন। অনেকে দেশে-বিদেশে যান উচ্চশিক্ষা নিতে। ফিরে এসে পান আরও করুণ বঞ্চনা। এমন পরিবেশে পৃথিবীর যেকোনো ভূগোল থেকে সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের নিয়ে এলেও একই পরিণতি হবে বলে আমরা ধারণা।
এই আত্মহননের প্রক্রিয়ায় মূলত জড়িয়ে পড়েন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী তরুণরা, যাদের অর্থ বা পারিবারিক সামর্থ্য থাকে না ভিন্ন কোথাও কর্মসংস্থানের। নিরাপদ সরকারি চাকরির প্রলোভনে কলেজের চাকরি বেছে নেন। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, সরকারি কলেজ থেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেওয়া হলো উচ্চশিক্ষা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যায়ের যে নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার ঘটছে, আপনাদের পরিণতি যে একদিন সরকারি কলেজের মতো হবে না— সে গ্যারান্টি কে দিল?
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, কুমিল্লা



