এবার ইসরায়েলিদের একাংশই বলছে 'নীরব থাকার সময় শেষ'
- অবৈধ বসতির পণ্যে ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত সাবেক ইসরায়েলি নেতা ও রাবীদের একাংশের

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েলের ভেতর থেকেই এখন এমন কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে, যারা মনে করছেন বসতি সম্প্রসারণের বর্তমান পথ দেশটির ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকিতে ফেলছে।
এক টুকরো জমির পর আরেক টুকরো জমি। পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ঘিরে যে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলছিল, এবার তা পৌঁছাল নতুন মোড়ে। ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেন কিছু বিশিষ্ট ইসরায়েলি নাগরিক ও ইহুদি ধর্মীয় নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, এটি ইসরায়েলবিরোধী পদক্ষেপ নয়; বরং বসতি সহিংসতা ও দখল নীতির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা।
বুধবার দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ সরকারের পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতির পণ্যে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক সেনাপ্রধান, সাবেক মন্ত্রী ও কূটনীতিকদের একটি অংশ “অনিবার্য পরিণতি” হিসেবে দেখছেন। তাঁদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা “ইসরায়েল রাষ্ট্রের বৈধতার বিরুদ্ধে নয়”, বরং সহিংসতা চালানো উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে।
সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট বলেছেন, পশ্চিম তীরে ধারাবাহিক সহিংসতার কারণে ব্রিটিশ পদক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। তার ভাষায়, নিষেধাজ্ঞা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়; এটি “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে”।
একই দিনে ব্রিটেনের ইহুদি সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রভাবশালী রাবী এড মিলিব্যান্ডের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন। মাসোর্তি ইহুদি ধর্মের প্রবীণ রাবী জোনাথন উইটেনবার্গ বলেছেন, পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা “ঈশ্বরের নামের চরম অবমাননা”। তার মতে, নীরব থাকার সময় শেষ হয়েছে। তিনি বলেছেন, এই পরিস্থিতি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য যেমন ভয়াবহ, ইসরায়েলের জন্যও তেমন ক্ষতিকর।
লিবারেল জিউইশ সিনাগগের রাবী আলেকজান্দ্রা রাইটও বলেছেন, দখলদারত্ব ও বাড়তে থাকা সহিংসতা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি–দুই পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি ব্রিটেনের অঙ্গীকারের অংশ।
তবে ব্রিটিশ ইহুদি সমাজে মতভেদও রয়েছে। প্রধান রাবী এফ্রাইম মিরভিস এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, এই নিষেধাজ্ঞা ব্রিটিশ ইহুদিদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। এড মিলিব্যান্ড সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইসরায়েল সরকারের নীতির সমালোচনা করা এবং ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই–দুটি বিষয় একসঙ্গে সম্ভব।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টারও পশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে ব্রিটেনের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জনমত জরিপেও বসতি-পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে উল্লেখযোগ্য সমর্থন দেখা গেছে। বিশেষ করে লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন সমর্থকদের মধ্যে এই সমর্থন বেশি। তবে বিরোধীরাও বলছে, এই পদক্ষেপ কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
এড মিলিব্যান্ডের সিদ্ধান্তের পর ইসরায়েল ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, লন্ডন নিজের মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান থেকে সরে যাবে না। তিনি বলেছেন, ব্রিটেনকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েলের ভেতর থেকেই এখন এমন কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে, যারা মনে করছেন বসতি সম্প্রসারণের বর্তমান পথ দেশটির ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকিতে ফেলছে। পশ্চিম তীর নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ তাই শুধু বাইরের সমালোচনা নয়; ইসরায়েলি সমাজের ভেতরেও তৈরি করছে নতুন বিতর্ক।
ব্রিটিশ সরকারের এই পদক্ষেপের অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত হলেও রাজনৈতিক বার্তা বড়। কারণ পশ্চিম তীরের বসতি ইস্যুতে এত দিন মিত্র দেশগুলোর নিন্দা থাকলেও বাস্তব নিষেধাজ্ঞার পথে যাওয়া ছিল বিরল। ফ্রান্স ও কানাডাও একই ধরনের পদক্ষেপের পথে রয়েছে। ফলে ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ছে। তবে তেল আবিব বলছে, এসব পদক্ষেপ একতরফা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ। এই সংঘাত এখন শুধু বাণিজ্যের নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ এখন দেখছে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপথ কতটা বদলে দেয়।



