জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে উগ্র ডানপন্থী এএফডির জয়

সাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্য নির্বাচনের আগে এএফডির শেষ নির্বাচনী সমাবেশে ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) নেতা অ্যালিস ভাইডেল ও টিনো ক্রুপালা এবং দলের প্রধান প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড। ছবি: রয়টার্স
জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, দলটি পেয়েছে ৪৩.৮ শতাংশ ভোট। তবে রাজ্য পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি দলটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম জার্মানির কোনো রাজ্যে এমন একটি দল সরকার গঠনের এত কাছাকাছি পৌঁছল, যে দলটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বড় অংশের কাছে ‘উগ্র ডানপন্থী’ হিসেবে পরিচিত।
নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৮৩ আসনের রাজ্য পার্লামেন্টে এএফডি পেয়েছে ৩৯টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৪২টি আসন। অর্থাৎ সরকার গঠনে দলটির আরও তিনটি আসন প্রয়োজন।
তবে ভোটের এই জয় যতটা ঐতিহাসিক, ক্ষমতায় যাওয়ার পথ ততটাই কঠিন। ভোটে বড় সাফল্য পেলেও সরকার গঠন এখনো নিশ্চিত নয় তাদের। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এএফডিকে জোটসঙ্গী খুঁজতে হবে। কিন্তু জার্মানির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এত দিন ধরে এএফডির সঙ্গে সহযোগিতা না করার নীতি অনুসরণ করে এসেছে।
তবুও এই ফল শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি জার্মানির রাজনৈতিক মানচিত্রে দ্রুত বদলে যাওয়া জনমতেরও ইঙ্গিত। বিশেষ করে পূর্ব জার্মানির বহু ভোটার কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভিবাসন প্রশ্নে অসন্তোষ থেকে এএফডির দিকে ঝুঁকেছেন।
নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মধ্য ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) পেয়েছে ১৭.২ শতাংশ ভোট। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস।
এএফডির প্রধান প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড ফল ঘোষণার পর বলেছেন, ‘আমরা যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, করেছি ঠিক সেটিই। আমরা এই রাজ্যে সৃষ্টি করেছি ইতিহাস।
দলের আরেক নেতা অ্যালিস ভেইডেলও ফলকে মন্তব্য করেছেন ‘ঐতিহাসিক’ বলে। তার মতে, এই ফল এএফডিকে সরকার পরিচালনার স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে।
নির্বাচনের ফল নিয়ে গতকাল রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো বক্তব্য দেননি মের্ৎস। স্থানীয় সময় রাত ১০টার পর তিনি দলটির প্রধান কার্যালয় কনরাড আডেনাওয়ার হাউস ত্যাগ করেন।
জার্মানির ১৬টি রাজ্যের কোনো সরকারে এখন পর্যন্ত এএফডি অংশ নেয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারেও দলটির অংশগ্রহণ নেই। এর আগে, দেশটির প্রধানধারার রাজনৈতিক দলগুলো এএফডির সঙ্গে জোট করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিলো।
এএফডি নেতা টিনো ক্রুপালা দাবি করেন, এই ফল দেখিয়ে দিয়েছে, ভোটাররা বর্তমান সরকারের নীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
গতকাল রবিবারের এই ফলকে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের কর্তৃত্বের জন্য আরেকটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ফেরাতে তার জোট সরকার যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন তার জনপ্রিয়তাও কমেছে।
একসময় যে রাজ্যে সিডিইউর শক্ত ঘাঁটি ছিল, সেখানেই এবার তাদের ভোট ব্যাপকভাবে কমেছে।
নির্বাচনে পিছিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফ্রিডরিখের মধ্য ডানপন্থী দল সিডিইউ। রাজ্যটির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সভেন শুলৎস এএফডিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, ফলটি তার দলের জন্য বড় আঘাত।
‘এই ফল আমাদের মেনে নিয়েই চলতে হবে’, বলছিলেন মুখ্যমন্ত্রী সভেন।
এএফডির উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অভিবাসন, অর্থনীতি এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। দলটি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা, আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে কড়া অবস্থান এবং ইউক্রেনকে সহায়তা কমানোর পক্ষে প্রচার চালিয়েছে।
তবে এএফডিকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা দলের কিছু অংশকে উগ্র ডানপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এএফডি অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল ইউরোপের রাজনীতিতেও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। অভিবাসনবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি যে শুধু ফ্রান্স, ইতালি বা অন্য কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধ নয়, জার্মানির মতো ঐতিহাসিকভাবে সতর্ক দেশেও তার প্রভাব বাড়ছে, এই ভোট সেই বার্তাই দিচ্ছে।
তবে জার্মানির এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব শুধু দেশের সীমানায় আটকে নেই। ইউরোপে থাকা অভিবাসী সমাজও নজর রাখছে এই পরিবর্তনের দিকে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য কী বার্তা
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসীদের মধ্যে এখন প্রশ্ন, এএফডির উত্থান কি ভবিষ্যতে জার্মানিতে যাওয়ার পথ আরও কঠিন করে তুলবে?
এএফডি দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে। দলটি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার, অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো এবং আশ্রয়প্রক্রিয়ায় কঠোরতার দাবি জানিয়ে আসছে।
তবে বৈধভাবে থাকা বাংলাদেশি নাগরিক, শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। কারণ জার্মানির অর্থনীতি এখনও দক্ষ বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণার মতো খাতে বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পরিবেশ আরও অভিবাসনবিরোধী হলে ভবিষ্যতে ভিসা নীতি, পারিবারিক পুনর্মিলন, আশ্রয়প্রক্রিয়া এবং বিদেশিদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জার্মানির রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এএফডির এই উত্থান কি শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচনী ফল, নাকি যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা?








