বন্ধু নির্বাচনে কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে বন্ধুত্ব শুধু সময় কাটানোর একটি সম্পর্ক নয়। একজন ভালো বন্ধু মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও ভবিষ্যৎকে সুন্দর করে তুলতে পারে, আবার ভুল বন্ধু তাকে ধীরে ধীরে এমন পথে নিয়ে যেতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। বিশেষ করে কৈশোর ও তারুণ্যে বন্ধুত্বের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই ইসলাম বন্ধু নির্বাচনের বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখেনি। কোরআন ও হাদিসে সৎ সঙ্গ গ্রহণ এবং অসৎ সঙ্গ পরিহারের বিষয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১৯) আয়াতটি শুধু সত্যবাদী হওয়ার নির্দেশ দেয় না, সত্যবাদী মানুষের সাহচর্য গ্রহণের দিকেও উৎসাহিত করে। কারণ মানুষ তার চারপাশের মানুষের আচরণ, ভাষা, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভালো মানুষের সান্নিধ্য তাই নিজেকে ভালো রাখার একটি কার্যকর উপায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বন্ধুর প্রভাব বোঝাতে অত্যন্ত সুন্দর একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ وَكِيرِ الْحَدَّادِ لاَ يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِمَّا تَشْتَرِيهِ أَوْ تَجِدُ رِيحَهُ وَكِيرُ الْحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ أَوْ ثَوْبَكَ أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً
‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে তুমি হয়তো আতর কিনবে, অথবা তার কাছ থেকে সুগন্ধ পাবে। আর কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।’ (বুখারি, হাদিস: ২১০১)
এই হাদিসে বন্ধুত্বের একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরা হয়েছে। একজন মানুষের চরিত্র শুধু তার নিজের ভেতরের বিষয় নয়; তার সঙ্গও তাকে গড়ে। সৎ বন্ধুর সঙ্গে থাকলে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়ে, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয় এবং জীবনের কঠিন সময়ে নৈতিক সাহস পাওয়া যায়। বিপরীতে অসৎ বন্ধু প্রথমে হয়তো শুধু বিনোদন বা আনন্দের সঙ্গী মনে হয়, কিন্তু তার অভ্যাস ধীরে ধীরে নিজের মধ্যেও প্রবেশ করতে পারে।
পবিত্র কোরআন এমন বন্ধুত্বের পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করেছে। কিয়ামতের দিনের একটি অনুশোচনার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘হায়! আমার দুর্ভোগ! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! সে তো আমাকে উপদেশ আসার পর তা থেকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছিল।’ (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত : ২৮-২৯) আয়াতটি মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার ভুল বন্ধুত্ব আখিরাতের আফসোসের কারণও হতে পারে।
একজন উত্তম বন্ধু হতে হবে বিশ্বস্ত, সত্যবাদী, আমানতদার, ভদ্র ও কল্যাণকামী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। অতএব, তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে সে কাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)
এই হাদিসের শিক্ষা আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আগে বন্ধুত্ব মূলত সামনাসামনি সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; এখন একজন মানুষের ‘বন্ধু’ ও ‘ফলো করা’ মানুষের সংখ্যা শত শত বা হাজারও হতে পারে। ফলে কার কথা শুনছি, কাদের জীবনধারা অনুসরণ করছি, কোন ধরনের চিন্তা নিয়মিত দেখছি এবং কার আচরণকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করছি, সেদিকেও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
অবশ্য ভালো বন্ধু নির্বাচনের পাশাপাশি নিজেকেও ভালো বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। শুধু এমন বন্ধু খুঁজলে হবে না, যে আমাদের ভালো রাখবে; আমরাও যেন বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াই, ভুল হলে সুন্দরভাবে সতর্ক করি এবং তার কল্যাণ কামনা করি।
তাই বন্ধু নির্বাচন জীবনের ছোট কোনো সিদ্ধান্ত নয়। একজন বন্ধু কখনো আমাদের সময়ের সঙ্গী হয়, আবার কখনো হয়ে ওঠে চিন্তার সঙ্গী, অভ্যাসের সঙ্গী এবং শেষ পর্যন্ত চরিত্রের অংশ। তাই বন্ধুত্বের আগে বাহ্যিক আকর্ষণ নয়, দেখতে হবে তার চরিত্র, মূল্যবোধ, সত্যবাদিতা ও আল্লাহভীতি। কারণ ভালো বন্ধু শুধু জীবনের আনন্দ ভাগ করে নেয় না, প্রয়োজনের সময় সঠিক পথও দেখায়। আর এমন বন্ধুত্বই দুনিয়ার সম্পর্ককে আখিরাতের সাফল্যের পথের অংশ করে তুলতে পারে।
লেখক: তরুণ আলেম







