মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ছায়ায় লাখো প্রবাসী

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তারে অনিশ্চয়তার মুখে কর্মরত লাখ লাখ এশীয় অভিবাসী শ্রমিক। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার যত বাড়ছে, ততই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ এশীয় অভিবাসী শ্রমিক। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সরাসরি ঝুঁকির পাশাপাশি কাজ বন্ধ হওয়া, আয় কমে যাওয়া, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক শহরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। হামলায় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
এই সংঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোর একটি এশীয় অভিবাসী শ্রমিকরা। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের নাগরিকদের বড় একটি অংশ নির্মাণ, পরিবহন, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, পণ্য সরবরাহ, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন জরুরি সেবায় কাজ করেন। ফলে যুদ্ধের সময় অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কর্মক্ষেত্রও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মার্চ ২০২৬-এ বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত ৩৮ জন ভারতীয়, নেপালি ও বাংলাদেশি শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নেয়। সংস্থাটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুদ্ধের কারণে শ্রমিকদের শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আয়-রোজগার ও চাকরি নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।
সবসময় থাকতে হয় আতঙ্কের মধ্যে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব শুধু নিরাপত্তার ওপর নয়, প্রবাসীদের কর্মজীবন ও মানসিক অবস্থার ওপরও পড়ছে বলে ‘আগামীর সময়’কে জানিয়েছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে কর্মরত কয়েকজন বাংলাদেশি।
সৌদি আরবপ্রবাসী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান আসাদের দাবি, যুদ্ধের মূল কেন্দ্র ইরান হলেও এর প্রভাব সৌদি আরবেও স্পষ্টভাবে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ ইরানে হলেও এর প্রভাব সৌদি আরবে খুব ভালোভাবেই পড়েছে। এখানে অনেক চাকরির সংকট তৈরি হয়েছে। সবসময় একটা আতঙ্কের মধ্যে আমাদের থাকতে হচ্ছে।’
দুবাইপ্রবাসী বিল্লাল মুনশি জানান, যুদ্ধের শুরুর দিকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে যুদ্ধের যে ভয়াবহতা, সেটা আমাদের ওপর পুরোপুরি পড়েছে। এখন পরিস্থিতি কিছুটা হালকা হলেও সবসময় একটা আতঙ্কের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।’
অন্যদিকে কুয়েতপ্রবাসী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ জানান, তিনি কুয়েত সেনাবাহিনীর একটি ব্যারাকে কাজ করেন। ফলে সংঘাতের পরিস্থিতিতে তার উদ্বেগ আরও বেশি। তিনি বলেন, ‘আমি কুয়েত সেনাবাহিনীর ব্যারাকে চাকরি করি। এ কারণে সবসময় একটা আতঙ্কের মধ্যে কাজ করতে হয়। প্রায়ই বোমা বা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই।’
যুদ্ধের মধ্যেও দেশে ফেরার সুযোগ নেই
অনেক শ্রমিকের জন্য দেশে ফিরে আসাও সহজ নয়। বিদেশে যাওয়ার আগে নেওয়া ঋণ, পরিবারের ওপর আর্থিক দায় এবং নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠানোর বাধ্যবাধকতার কারণে তারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও কর্মস্থলে থেকে যেতে বাধ্য হন। যুদ্ধের ভয় থাকলেও জীবিকার প্রয়োজন তাদের আটকে রাখে।
সংঘাতের প্রভাব শুধু কর্মসংস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের দামে চাপ তৈরি হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনেও বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা। এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে সংঘাত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা কিংবা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে শ্রমিকরা গ্রেপ্তার বা অন্যান্য শাস্তির আশঙ্কা করছেন। অনেক শ্রমিক মানবাধিকার সংগঠন বা গণমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে যেসব অভিবাসী শ্রমিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, সংকটের সময় তাদের নিরাপত্তাকে আলাদা অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণেও এশীয় অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য যুদ্ধকালীন সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজন বিশেষ সুরক্ষাকবচ
বাংলাদেশসহ শ্রমিক পাঠানো দেশগুলোর উচিত উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান শ্রমচুক্তিতে যুদ্ধকালীন জরুরি প্রোটোকল যুক্ত করা। এর আওতায় বহুভাষিক জরুরি সতর্কবার্তা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশাধিকার, জরুরি চিকিৎসা, পাসপোর্ট ও নথিপত্রের নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের কারণে কাজ বন্ধ হলে শ্রমিকের মজুরি ও ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা থাকতে পারে।
এই শ্রমিকরা শুধু প্রবাসী নন, তাদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভর করছে লাখো পরিবার এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির একটি বড় অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তাই মানবিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রেমিট্যান্সনির্ভর পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, দ্য ডিপ্লোম্যাট, রয়টার্স ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল






