এএফডির জয়
জার্মানিতে বাংলাদেশিসহ বিদেশিদের কী হবে?

জার্মানির নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল এএফডি। ছবি: সংগৃহীত
পূর্ব জার্মানির সাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর ডয়েসল্যান্ড (এএফডি)। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি পেয়েছে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার এএফডির ভোট বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এই জয়ে রাজ্যটিতে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ অভিবাসীদের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
তবে বিপুল ভোট পেয়েও এককভাবে সরকার গঠন করতে পারছে না এএফডি। ৮৩ আসনের রাজ্য আইনসভায় দলটি পেয়েছে ৩৯টি আসন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৪২টি আসন। ফলে সরকার গঠনে অন্য দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে এএফডির।
বিদেশিদের নিয়ে এএফডি কী চায়?
অভিবাসন নীতি ছিল এএফডির নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয়। দলটি জার্মানিতে অভিবাসন কমানো, রাজনৈতিক আশ্রয় প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা এবং অবৈধভাবে বসবাসকারীদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পক্ষে। নির্বাচনী প্রচারে দলটি বারবার ‘রেমিগ্রেশন’ বা প্রত্যাবাসনের কথা বলেছে। এএফডির নেতারা দাবি করেছেন, বিদেশিদের কারণে সরকারের ব্যয় বেড়েছে এবং জার্মানদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। তাই ক্ষমতায় গেলে অভিবাসন কমানোর পাশাপাশি বিদেশিদের আশ্রয় খাতে সরকারি ব্যয়ও কমাতে চায় দলটি।
বাংলাদেশিদের জন্য ঝুঁকি কোথায়?
এএফডি রাজ্য নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বলেই জার্মানিতে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী বা পরিবারগুলোকে এখনই দেশ ছাড়তে হবে কিংবা তারা সরাসরি সংকটে পড়বেন, এমন নয়। ঝুঁকিটা মূলত ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও অভিবাসন নীতি নিয়ে। এএফডি রাজ্য সরকারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় সরকারেও প্রভাবশালী অবস্থানে যেতে পারলে অভিবাসন, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং বিদেশিদের জন্য সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে।
সাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের রাজধানী মাগডেবুর্গে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাকিব ‘আগামীর সময়কে’ বলেন, রাজ্য সরকার চাইলেই পুরো জার্মানির অভিবাসনব্যবস্থা বদলে দিতে পারে না। নাগরিকত্ব, সীমান্তনীতি ও অভিবাসনের বড় অংশ ফেডারেল সরকারের আওতায়। তবে রাজ্যের হাতে থাকা শিক্ষা, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, আশ্রয়কেন্দ্র এবং ভিসা নবায়নের মতো কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে।
রাকিব বলেন, ‘জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা অনেকটাই ফ্রি। শোনা যাচ্ছে, এই রাজ্যে বিদেশীদের এখন থেকে টিউশন ফি দিতে হবে। বৃত্তিসহ শিক্ষার্থীদের জন্য রাজ্য সরকারের ফান্ডও কাটছাট করা হবে। তাই জার্মানিতে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য নির্বাচনের ফলটি তাৎক্ষণিক আইনি পরিবর্তনের চেয়ে একটি বড় রাজনৈতিক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
বৈধ বাংলাদেশিদের কি ভয় পাওয়ার কারণ আছে?
জার্মানির কমিউনিটি সংগঠক ড. শফিকুল ইসলাম ‘আগামীর সময়কে’ বলেন, বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩০ হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে যারা বৈধভাবে শিক্ষা ভিসা বা চাকরির ভিসা নিয়ে সাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে আছেন, তাদের অধিকার বিদ্যমান জার্মান ও ইউরোপীয় আইনের আওতায় রয়েছে। একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী কিংবা পরিবারের সদস্যের বৈধ বসবাসের অধিকার শুধু একটি রাজ্য নির্বাচনের ফলাফলে বাতিল হয়ে যায় না।
তবে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি যত শক্তিশালী হবে, অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক নীতিও তত কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ড. শফিকুল ইসলাম। বিশেষ করে নতুন করে যারা জার্মানিতে আসতে চান, তাদের ভবিষ্যতের নীতির দিকে নজর রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তাই এখন থেকে যারা জার্মানিতে আসবেন, সবার উচিত হবে জার্মান ভাষা ভালোভাবে শিখে তারপর জার্মানিতে আসা। আর যেসব রাজ্যে তুলনামূলকভাবে মধ্যমপন্থী সরকার ক্ষমতায় সেসব রাজ্য পছন্দের তালিকায় রাখা।’
এএফডি সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু ক্ষমতায় যেতে পারবে কি?
সাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে এএফডির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)। দলটি পেয়েছে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি) পেয়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ, গ্রিন পার্টি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বামদল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএসডব্লিউ পেয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট।
পাঁচটি আসন পাওয়া বিএসডব্লিউ এখন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সিডিইউ, এসপিডি, গ্রিন পার্টি ও বামদল এএফডির সঙ্গে সরকার গঠনে রাজি নয়। ফলে নির্বাচনের পর বিএসডব্লিউর অবস্থান নিয়ে জল্পনা বেড়েছে।
ফলে সাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির বড় জয় জার্মানির অভিবাসন রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিলেও আপাতত রাজ্য সরকার গঠনের সমীকরণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশিসহ অভিবাসীদের জন্য এ ফল ভবিষ্যৎ নীতির সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।






