ইসরায়েল
সরকার গঠনের দায়িত্ব এখন আইজেনকোটের কাঁধে, পথ কতটা কঠিন

প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ জেরুজালেমে তার সরকারি বাসভবনে শনিবার গাদি আইজেনকোটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন— রয়টার্স
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা এ নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আরও এক ধাপ কাছে পৌঁছাবেন তিনি। তবে সেই পথ এখনো বেশ জটিল।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতৃত্ব দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের হাতে সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহ সময় থাকবে। এ সময়ের মধ্যে তাকে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে একটি জোট গঠন করতে হবে। তবে ক্ষমতায় যাওয়ার পথে রাজনৈতিক বাধা এবং বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভাজন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে রবিবার আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। গত সপ্তাহে টানা দুদিন নেসেটে নির্বাচিত সব দলের সঙ্গে পরামর্শ করার পর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন হারজগ।
নতুন নেসেটের ৬৭ সদস্য আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে আরবের দুটি দলের ১৯ জন সদস্যও রয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশ করেছেন মাত্র ৪৬ জন। পরামর্শের সময় তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ জোটে বড় ধরনের ফাটলও প্রকাশ্যে আসে। নেতানিয়াহুর ঐতিহ্যগত মিত্র ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম তাকে সমর্থনের সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
সেনাপ্রধান আইজেনকট এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে কী অবস্থান
০৮ নভেম্বর ২০২৬
তবে হারজগের এ সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে নেতানিয়াহু স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতা হারাচ্ছেন। কাগজে-কলমে আইজেনকোটের সরকার গঠনের দায়িত্ব এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কিন্তু এখনো তার কোনো কার্যকর সরকার গঠনের জোট নেই।
আইজেনকোট তার ভাষায় একটি ‘জাতীয় জরুরি সরকার’ গঠনের চেষ্টা করছেন। যত দ্রুত সম্ভব একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে শপথ নেওয়ানোর পক্ষেও তিনি। এই সরকারে থাকবে চারটি ইহুদিবিরোধী দল। দলগুলোর মোট আসন ৪৮টি। এগুলো হলো তার নিজের ইয়াশার পার্টি; সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন টুগেদার; আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু এবং ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস।
সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য চারটি শর্ত দিয়েছেন আইজেনকোট। সেগুলো হলো—ইসরায়েলকে ইহুদি, গণতান্ত্রিক, উদারপন্থী ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া; স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার; সামরিক, জাতীয় কিংবা বেসামরিক— যেকোনো ধরনের সর্বজনীন দায়িত্ব পালন এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
শেষ শর্তটির কারণে কার্যত আরব দলগুলোর পক্ষে মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে তারা মন্ত্রিসভার বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দিতে পারে, যা সংসদে সরকারকে নিরাপত্তা দেবে। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট। কিন্তু কোনো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা অনেক কঠিন। এর জন্য বিকল্প সরকারকে সমর্থন জানিয়ে অন্তত ৬১টি ভোট প্রয়োজন। নেসেটে মোট আসন ১২০টি।
আইজেনকোটের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা আভিগদর লিবারম্যান। ইসরায়েল বেইতেনু দলের এ নেতা বিভিন্ন সময়ে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। তার যুক্তি, সংখ্যালঘু সরকার বেশিদিন টিকবে না এবং দীর্ঘ মেয়াদে তা নেতানিয়াহুকেই শক্তিশালী করবে। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিবারম্যান লেখেন, ‘আমরা দেখব, নেতানিয়াহু আবার ৭০টি আসন নিয়ে ফিরবেন এবং আরও চার বছর ক্ষমতায় থাকবেন। এরপর ধ্বংসের পথে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।’
এর পরিবর্তে ভিন্ন একটি পথের প্রস্তাব দিয়েছেন লিবারম্যান। অতি-রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গে জোট না করার দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি শাস জোট ও ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম— এই দুই অতি-রক্ষণশীল দলকে নিয়ে ৬১ জন আইনপ্রণেতার জোট গঠনে ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম দল থাকবে না। জোট গঠনের পর লিকুদ পার্টির তিন বা চারজন আইনপ্রণেতা দল ছেড়ে এই জোটে যোগ দিতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
তবে এই পরিকল্পনাবিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অতি-রক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিরোধী দলগুলো। অতি-রক্ষণশীল দলগুলো এ অব্যাহতি আইনে স্থায়ী করার জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রচারের সময় আইজেনকোট, লিবারম্যানসহ বিরোধী নেতারা সবার জন্য বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছিলেন। তা ছাড়া, অতি-রক্ষণশীল দলগুলোর একটির অবস্থান এখনো নেতানিয়াহুর পক্ষেই রয়েছে।
সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো নেতানিয়াহুও ইহুদি ও আরবদের মধ্যে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সহযোগিতা ঠেকাতে জোরালো চাপ প্রয়োগ করছেন। তিনি নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে দাবি করেছেন, ঘুষ ও বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে আরব দলগুলো ভোট ‘চুরি’ করেছে। তার অনুগত শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনি কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ ছাড়াই আরব রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর চেষ্টা করছেন।
এক ভিডিও বিবৃতিতে শনিবার নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেন, আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হলে ইসরায়েল ‘কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারবে না’। এর পরিবর্তে তিনি তার পুরো জোটকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। এই জোটে অতি-ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল দলগুলোও রয়েছে। নেতানিয়াহু বললেন, ‘যেসব জায়নবাদী দল আমাদের ইহুদি জনগণের একমাত্র রাষ্ট্রটি রক্ষা করতে চায়, তাদের সবাইকে’ নিয়ে সরকার গঠন করতে হবে।
আইজেনকোট তার এই বক্তব্যকে ‘করুণ অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ইয়াশার পার্টির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘লিকুদ যদি বৃহত্তর ঐক্যের সরকার চায়, তাহলে উগ্রপন্থীদের সঙ্গে তাদের জোট ভেঙে প্রধানমন্ত্রী আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে।’
নতুন নেসেটের সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার আইজেনকোটের প্রথম পরীক্ষা শুরু হবে। বিরোধী দলগুলো নেতানিয়াহুর মনোনীত নেসেট স্পিকারকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে ক্ষমতার ওপর নেতানিয়াহুর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে এবং বিরোধী দলগুলো কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এর মধ্যে হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থায় যেসব ব্যর্থতা ছিল, তা তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগও রয়েছে।
রবিবার থেকে মন্ত্রিসভার পদ, বাজেট ও নীতিমালা নিয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য আইজেনকোট ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো হতে পারে। তিনি ব্যর্থ হলে সরকার গঠনের দায়িত্ব আরও চার সপ্তাহের জন্য নেতানিয়াহুর হাতে যাবে।
আইজেনকোট শুক্রবার বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব সরকার গঠন করতে চান তিনি। পরিস্থিতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘এমন পরিস্থিতি, যেখানে জনগণের আস্থা চরমভাবে হারানো সংখ্যালঘু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তাব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো পরিচালনা করে যাচ্ছেন, তা বিপজ্জনক। এ অবস্থা আর এক দিনও চলতে দেওয়া যায় না।’
সূত্র: সিএনএন






