এমপিহীন সীতাকুণ্ডে আইনশৃঙ্খলা ঢিলা
- বিএনপিতে মারামারি
- খাল খননের বরাদ্দ আসেনি
- ভবিষ্যৎ কেউ জানে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের সংসদীয় ৩০০ আসনের মধ্যে একমাত্র (চট্টগ্রাম-৪) সীতাকুণ্ড উপজেলা চলছে সংসদ সদস্য (এমপি) ছাড়া। ৯ মাস ধরে অভিভাবকহীন থাকার কারণে উপজেলাটিতে দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নানা সমস্যা। পাশাপাশি বিশাল এই জনপদের জন্য আসছে না উন্নয়ন বরাদ্দ। একই কারণে লক্ষ করা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও।
ভারী শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ডে বড় বড় ইস্পাত কারখানার অবস্থান। রয়েছে বড় বড় শিল্প গ্রুপের কারখানা। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও শীর্ষ জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের অবস্থানও সীতাকুণ্ডে। চট্টগ্রাম নগরের দুটি ওয়ার্ড এবং সীতাকুণ্ড উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটিতে ৬ লাখ লোকের বসবাস। কিন্তু সংসদ সদস্য না থাকায় বিপাকে প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে জয় পান বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী। কিন্তু ঋণখেলাপিজনিত আদালতের আদেশের কারণে শপথ নিতে পারেননি তিনি। এ নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন ওই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী। সবশেষ ৩০ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের রায় দেন। ফলে আসনটি শূন্য হয়ে পড়ে।
নেই উন্নয়ন বরাদ্দ
সংসদ সদস্য না থাকায় সীতাকুণ্ড উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়নকাজের বরাদ্দ আসছে না। এ ছাড়া এলাকার সমস্যা সমাধানেও নেই গতি। সংসদে এই এলাকার হয়ে কথা বলার নেই কেউ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজেলার তুলনায় অন্তত ২ কোটি টাকা কম বরাদ্দ পেয়েছে উপজেলাটি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় চট্টগ্রাম-৪ আসনের জন্য টিআর ও কাজের বিনিময়ে খাদ্যের (কাবিখা) বরাদ্দ প্রথম দুই ধাপে কম এসেছে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। জিআর বরাদ্দও অন্য উপজেলার তুলনায় অনেকটাই কম এসেছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া খাল খননের বরাদ্দও পাওয়া যায়নি। দুটি খাল ছিল; কিন্তু বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এতে আনুমানিক ২ কোটি টাকার মতো বরাদ্দবঞ্চিত হয়েছে উপজেলাটি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জামিরুল ইসলাম বললেন, ‘সংসদ সদস্যদের নামে বিশেষ টিআর ও কাবিখা বরাদ্দ আসে। বছরে দুয়েকটি বিশেষ বরাদ্দ হয়। এবার ৩৭ লাখ টাকার টিআর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আমার এখানে দুটি খাল খনন করা দরকার ছিল। এজন্য অন্তত ২ কোটি টাকা পাওয়া যেত; কিন্তু খাল খননের জন্য ১ টাকা বরাদ্দও পাওয়া যায়নি।’
সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিদারুল আলম চৌধুরী বলছিলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধি না থাকায় বরাদ্দসহ নানা ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। খাল-নালা সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে দেখা দিয়েছে ধীরগতি।’
আইনশৃঙ্খলার অবনতি, প্রশাসনিক স্থবিরতা
এমপিবিহীন উপজেলার প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। গত অক্টোবর মাসে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুটি ডাকাতি ও একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সমুদ্র উপকূল থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কেউ এগুলো দেখার নেই। বালু উত্তোলন নিয়ে গত ছয় মাসে খুন হয়েছেন তিনজন।
প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংসদ সদস্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। ব্যবসায়িক নানা কাজেও সংসদ সদস্যের সুপারিশ লাগে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সংসদ সদস্যের উপদেশ নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে থাকেন। সাধারণত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সংসদ সদস্যের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তবে সংসদ সদস্য বাতিল হলেও সীতাকুণ্ডের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সভায় আসলাম চৌধুরীর হয়ে উপস্থিত থাকেন উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ মোরসালিন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আগামীর সময়কে বললেন, ‘এমপি না থাকার কারণে এখানে প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বরাদ্দ আসছে না। প্রশাসন নিজের মতো করে চলছে। অভিভাবকহীন।’
বিএনপিতে কোন্দল
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সীতাকুণ্ডে প্রথমে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল কাজী সালাহউদ্দিনকে। পরে তাকে বাদ দিয়ে বিএনপির নেতা আসলাম চৌধুরীকে প্রার্থী করা হয়। নির্বাচনের পর আসলাম চৌধুরী ও কাজী সালাহউদ্দিন অনুসারী হিসেবে দুটি পক্ষ সৃষ্টি হয়। দুটি পক্ষ এখন পৃথকভাবে বিভিন্ন দলীয় ও সরকারি অনুষ্ঠান করে থাকে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির সদস্য সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বললেন, ‘সালাহউদ্দিনের জায়গায় আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ার পর আমরা সবাই কাজ করেছি। দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে এনেছিলাম। এরপর তিনি নির্বাচিত হয়ে কমিটি ভেঙে দেন। কিন্তু কমিটি ভাঙার এখতিয়ার ওনার নেই। আমাদের কমিটি এখনো বৈধ। তখন থেকে বিএনপিতে দুটি পক্ষ সক্রিয় হয়েছে।’
ভবিষ্যৎ কী
আপিল বিভাগের রায়ের পর কার্যত আসনটি শূন্য হয়ে পড়ে। তবে আপিল বিভাগের আদেশের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো পাওয়া যায়নি। আদেশের অনুলিপির জন্য অপেক্ষা করছেন আসলাম চৌধুরী। এটি পেলে তিনি রিভিউ করবেন বলে জানিয়েছেন। যদি রিভিউতেও আগের আদেশ বহাল থাকে, তাহলে পুনরায় নির্বাচন ঘোষণা করতে হবে আসনটিতে। এখন পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
আইনিপ্রক্রিয়া সব শেষ হয়ে যদি আপিল বিভাগের আদেশ রিভিউতে বহাল থাকে, তাহলে নতুন নির্বাচন দিতে হবে বলে জানালেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বশির আহমেদ। তিনি বললেন, ‘আপিল বিভাগের বর্তমান আদেশ অনুযায়ী যেহেতু উনার (আসলাম চৌধুরী) প্রার্থিতা বাতিল, তাই আসনটি এখন পর্যন্ত শূন্য। রিভিউতে কী হয় তার ওপর নির্ভর করবে।’



