হোটেলশ্রমিক সোহেলের মজুরিতে রাস্তা সংস্কার

রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেন সোহেল রানা
হোটেলশ্রমিক সোহেল রানা (২৫)। তার প্রতিদিনের মজুরি ৪২০ টাকা। এই সামান্য আয়ে চলে তার সংসার। আর এই উপার্জনের একটি অংশ ব্যয় করছেন মানুষের চলাচলের পথ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে। গত চার বছরে নিজ উদ্যোগে প্রায় ১ হাজার ৭০০ স্থানে রাস্তার পাশের আগাছা, ঝোপঝাড় ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেছেন। ৪০টির বেশি স্থানে ইট, খোয়া, বালু ফেলে এবং ঢালাই করে রাস্তার খানাখন্দ সংস্কার করেছেন।
সোহেল রানা লালমনিরহাট পৌরসভার খোচাবাড়ী এলাকার এরশাদুল হকের ছেলে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইদের মধ্যে বড় হওয়ায় ছোটবেলায়ই পরিবারের অভাব-অনটনের সঙ্গে পরিচয় তার। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোনোর আগেই পরিবারে অর্থ জোগান দিতে ১২ বছর বয়সে দিনমজুরি শুরু করেন। বছর চারেক আগে বেছে নেন হোটেলশ্রমিকের কাজ।
বর্তমানে লালমনিরহাট শহরের মিশন মোড় এলাকার সাগাইবাড়ী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন সোহেল। হোটেলে ন্যূনতম আট ঘণ্টা কাজ করেন। কাজ শেষে অন্যরা যখন বিশ্রাম নেন, তখনই শুরু হয় তার আরেকটি কাজ। হাতে কোদাল, ঝাড়ু কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এলাকার সড়ক সংস্কার ও পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কারে।
এক সন্তানের বাবা সোহেল রানা জানিয়েছেন, তিনি কোথাও রাস্তার ওপর জমে থাকা আবর্জনা সরান, কোথাও পরিষ্কার করেন রাস্তার পাশের আগাছা, আবার কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামত করে মানুষের চলাচলের উপযোগী করেন। একেকটি খানাখন্দ মেরামতে ইট, খোয়া ও বালু কিনতে নিজের দিনমজুরির টাকা থেকেই ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। এভাবে বিভিন্ন স্থানে রাস্তার ৪০টির বেশি খানাখন্দ মেরামত করেছেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে যা প্রয়োজন, সাধ্যমতো তা করার চেষ্টা করছেন।
সোহেলের এই পথচলা শুরুতে সহজ ছিল না। নিজের সামান্য আয় থেকে রাস্তা মেরামতে টাকা খরচ করায় পরিবারের নানা কথা শুনতে হয়েছে। তবে মানুষের উপকার করার ইচ্ছার কাছে কোনো কিছুই তার বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
সোহেল রানার ভাষ্য, যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শিশু শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ চলাচল করেন, সেই পথ একটু ভালো থাকলেই তিনি তৃপ্তি পান। আমৃত্যু তিনি এ কাজ করে যেতে চান।
পরিবেশকর্মী খাইরুল ইসলাম জানালেন, একজন হোটেলশ্রমিক হয়েও নিজের টাকা খরচ করে তার এমন কাজ সত্যি বিরল। দিন শেষে মাত্র ৪২০ টাকা মজুরি নিয়ে বাড়ি ফেরা এই যুবকের স্বপ্ন নিজের জন্য বড় কিছু অর্জন করা নয়; বরং কারও যেন চলাচলে কষ্ট না হয়, সেজন্য পথটা একটু ভালো করা। নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছেন তিনি।
খাইরুলের মতে, সোহেলের এই উদ্যোগ সমাজের অন্য যুবকদের জন্য অনুকরণীয়। বিপুল অর্থ কিংবা বড় কোনো পদ-পদবি নয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মানবিক সদিচ্ছাই যে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হতে পারে, তারই উজ্জ্বল উদাহরণ সোহেল রানা। প্রতিদিনের সামান্য মজুরির একটি অংশ দিয়ে মানুষের পথচলা সহজ করার এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, ইচ্ছা থাকলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সমাজের জন্য অনেক কিছু করা সম্ভব।
মোগলহাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান দুলাল হোসেন মনে করেন, সোহেল রানা যে সামাজিক কাজগুলো করছেন, তাতে নিঃসন্দেহে তিনি প্রশংসার দাবিদার। তাকে দেখে অনেক যুবক সামাজিক কাজের অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন।



