পাঁচ দিনের ঝড়: ৩ থেকে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো শুধু দিন নয়; তারা যেন অস্থিরতার কালো পাখি হয়ে জাতির আকাশে উড়ে বেড়ায়। ১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর ছিল তেমনই পাঁচটি দিন। পাঁচ দিন, অথচ তার ভেতরে যেন পাঁচ যুগের অস্থিরতা জমাট বেঁধেছিল। রাষ্ট্রের ভাগ্য, সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বিপ্লবের স্বপ্ন, ক্ষমতার বাস্তবতা, ব্যক্তিগত আনুগত্য আর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা— সবকিছু এক ভয়ংকর ঘূর্ণাবর্তে জড়িয়ে পড়েছিল।
এই পাঁচ দিনের মঞ্চে তিনজন মানুষ ছিলেন মুখ্য চরিত্র— খালেদ মোশাররফ, আবু তাহের আর জিয়াউর রহমান। তিনজনই মুক্তিযুদ্ধের সন্তান। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ভাগ্য নিয়ে তাদের স্বপ্ন ছিল ভিন্ন। আর সেই ভিন্ন স্বপ্নগুলোই একসময় পরিণত হলো ত্রিমুখী সংঘর্ষে।
১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ভোরে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এক সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর গভীরে এক অদৃশ্য ভূমিকম্প শুরু হয়। ক্ষমতায় আসেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তারা ঢাকার ক্ষমতার করিডরে অবাধ বিচরণ করতে থাকেন। সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাদের মনে প্রশ্ন ছিল, একটি রাষ্ট্র কি এভাবে চলতে পারে?
সেনাবাহিনীর ভেতরে নিঃশব্দে জমতে লাগল অগ্নিগর্ভ অসন্তোষ। সেই অগ্নিগর্ভ পরিবেশে কয়েকজন কর্মকর্তা ধীরে ধীরে সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। তাদের সামনে থাকলেন খালেদ মোশাররফ। তার বিশ্বাস ছিল, সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অফিসারদের সেনানিবাসে ফিরিয়ে আনতে হবে। চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধার করতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই শুরু হলো প্রস্তুতি।
৩ নভেম্বরের ভোরে ঢাকা ছিল অদ্ভুত নীরব। শহরের গাছে গাছে তখনো হেমন্তের শেষ আলো। কিন্তু ক্যান্টনমেন্টে বাতাসের মধ্যে বারুদের গন্ধ। সেদিন খালেদ মোশাররফ তার উদ্যোগ শুরু করলেন। এটি কোনো জনতার বিপ্লব নয়; ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা। জিয়াউর রহমান তখন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গিয়ে খালেদ প্রথমেই ভাঙলেন চেইন অব কমান্ড। জিয়াকে গৃহবন্দি করলেন। ট্যাংকের গর্জন খুব বেশি শোনা যায়নি। কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে শুরু করল। ঢাকার রাস্তায় সাধারণ মানুষ তখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেনি কী ঘটছে।
কিন্তু সেই দিনটির আরেকটি ভয়াবহ অধ্যায় ছিল। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল তখন নিঃশব্দ। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে হত্যা করা হলো মুক্তিযুদ্ধের চার জাতীয় নেতাকে— তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান। যুদ্ধের দিনগুলোতে যারা একটি রাষ্ট্রের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন, তারা কারাগারের অন্ধকারে প্রাণ হারালেন। ইতিহাস কখনো কখনো এত নির্মম হয় যে তাকে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেদিন যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম অধ্যায়ের অনেক পৃষ্ঠা রক্তে ভিজে গেল।
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী অফিসারদের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। মোশতাকের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ল। বাহ্যিকভাবে সবকিছু দেখে মনে হচ্ছিল, খালেদ জয়ী। কিন্তু ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, অনেক সময় দৃশ্যমান বিজয়ের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে পরাজয়ের বীজ।
খালেদ মোশাররফ ছিলেন একজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা। কিন্তু রাজনীতির নিষ্ঠুর গোলকধাঁধা প্রায়ই সামরিক শৃঙ্খলার সরল যুক্তি মানে না। তিনি সেনাবাহিনীর শীর্ষস্তরে প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। নিচের স্তরের সৈনিকদের মনোজগতে আরেকটি স্রোত তৈরি হচ্ছিল। সেই স্রোতের নাম ছিল আবু তাহের।
আবু তাহের ছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সামরিক সংগঠনের প্রধান। জাসদ চেয়েছিল বিপ্লব। দলটি বিশ্বাস করত, সেনাবাহিনীর ভেতরে শ্রেণি বৈষম্য রয়েছে। উচ্চপদস্থ অফিসারদের আধিপত্য ভেঙে সৈনিকদের ক্ষমতায়ন করতে হবে। এই ভাবনা নিয়ে সেনানিবাসে তৈরি হয় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। তাহের এর নেতা। তাদের ভাবনা, সিপাহি এবং জনতা একসঙ্গে রাষ্ট্র বদলাবে।
এই ভাবনা অনেক তরুণ সৈনিককে আকৃষ্ট করেছিল। তারা নিজেদের সংগ্রাম, বঞ্চনা ও ক্ষোভের প্রতিধ্বনি শুনতে পেত তাহেরের কণ্ঠে। আর সেই ক্ষোভই কয়েক দিনের মধ্যে বিস্ফোরিত হতে চলেছিল।
ঢাকার আকাশ তখনো অন্ধকার। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা সেনানিবাসে ছড়িয়ে পড়ল অস্থিরতা। সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হলো। সেই আন্দোলনের ঢেউ দ্রুত ছড়িয়ে গেল। শৃঙ্খলার দেয়াল ভেঙে পড়তে লাগল। অফিসারদের কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হলো। সেনানিবাসের বাতাসে তখন শুধু স্লোগান, উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার শব্দ। ইতিহাস কখনো কখনো সমুদ্রের জোয়ারের মতো। একবার প্রবল স্রোত শুরু হলে কোনো বাঁধই তাকে থামাতে পারে না। সেদিনও তাই হলো।
সেই স্রোতের মুখে সবচেয়ে আগে ভেসে গেলেন খালেদ মোশাররফ। তিনি হয়তো বিশ্বাসই করতে পারেননি, মাত্র কয়েক দিন আগের সাফল্য এভাবে ভেঙে পড়বে। একসময় তাকে হত্যা করা হলো। ইতিহাসে এমন কত মানুষ আছেন, যারা যুদ্ধক্ষেত্রের গুলিকে পরাজিত করেছেন, কিন্তু রাজনীতির ছুরিকে পারেননি। খালেদ তাদেরই একজন।
৭ নভেম্বরের সকাল। মনে হচ্ছিল, এবার জাসদের স্বপ্ন সফল হতে চলেছে। বিদ্রোহী সৈনিকরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাহেরের অনুসারীরা উচ্ছ্বসিত। গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে এলেন জিয়াউর রহমান। তিনি জনতার ভাষণে নয়, বিপ্লবী স্লোগানে নয়, বরং নীরব উপস্থিতিতে সামনে এলেন। তার ক্ষমতার বাস্তব গণিত বুঝে এগিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা।
বাংলাদেশ তখন ক্লান্ত। একটি জাতি মাত্র কয়েক মাসে একের পর এক অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড ও ষড়যন্ত্রের সাক্ষী হয়েছে। মানুষ স্থিতি চাইছিল। সেনাবাহিনীও স্থিতি চাইছিল। আর এই চাওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে ধীরে ধীরে উঠে এলেন জিয়া।
ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ দৃশ্যগুলোর একটি হলো, বিপ্লব অনেক সময় নিজের সন্তানদেরই গ্রাস করে। আবু তাহের মনে করেছিলেন, তিনি ইতিহাসকে নতুন দিকে ঘুরিয়ে দেবেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি নিজেই ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়লেন। যে পরিবর্তনের তিনি ছিলেন অন্যতম অনুঘটক, সে মানুষটিই পরবর্তীকালে বিচারের মুখোমুখি হলেন। অবশেষে তার জীবনের পরিণতি হলো ফাঁসির মঞ্চে।
একটি তারিখ, অথচ তার মালিকানা দাবি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি। কেউ এটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলেন। কেউ দেখেন সামরিক শৃঙ্খলার বিপর্যয় হিসেবে। কেউ মনে করেন এটি ছিল আরেকটি অভ্যুত্থান। আবার অনেকে বলেন, ৭ নভেম্বরের বাস্তবতা এত জটিল যে সেটিকে একক রাজনৈতিক স্লোগানের মধ্যে বন্দি করা যায় না। এটি একই সঙ্গে বিদ্রোহ, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রগঠনের সংকটের দিন।
১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৭ নভেম্বরকে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। এখানে উঠে আসে কয়েকটি প্রশ্ন। যদি খালেদ মোশাররফ বেঁচে থাকতেন, বাংলাদেশ কি ভিন্ন পথে যেত? যদি আবু তাহেরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতো, রাষ্ট্র কি অন্য রূপ নিত? যদি জিয়াউর রহমান সেই দিন মুক্ত না হতেন, তাহলে কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা নেই। ইতিহাসের সৌন্দর্যও হয়তো সেখানেই। নভেম্বরের সেই পাঁচ দিন শুধু অতীত নয়; তা আজও বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতির অংশ। সেখানে খালেদের শৃঙ্খলার স্বপ্ন আছে, তাহেরের বিপ্লবের স্বপ্ন আছে, জিয়ার ক্ষমতা-সংহতির অধ্যায় আছে। সেখানে বীরত্ব আছে, ষড়যন্ত্র আছে, বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আছে, আবার আছে অসমাপ্ত স্বপ্নের দীর্ঘ ছায়া।
নভেম্বরের সেই দিনগুলো যেন এক নদীর মোহনা, যেখানে তিনটি স্রোত এসে মিলেছিল। খালেদ মোশাররফের স্রোত, আবু তাহেরের স্রোত, জিয়াউর রহমানের স্রোত। সংঘর্ষের শেষে একটি স্রোত মূল নদী হয়ে সামনে এগিয়ে যায়, অন্য দুটি ইতিহাসের উপনদী হয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু উপনদী হারিয়ে যায় না। তারা মানচিত্রে রয়ে যায়। স্মৃতিতে রয়ে যায়। বিতর্কে রয়ে যায়। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে ৩ থেকে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫, আজও সেই অমীমাংসিত আদালত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সাক্ষ্য শেষ হয়েছে, যুক্তি শেষ হয়েছে, কিন্তু চূড়ান্ত রায় এখনো লেখা বাকি।
লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



