৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপের নিচে গাজা
- চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মরদেহ

একসময় যেখানে ছিল ঘরবাড়ি, দোকানপাট, অফিস আর মানুষের ভিড়, এখন সেখানে শুধুই ধ্বংসস্তূপ। সেই ধ্বংসস্তূপ সরাতে গিয়ে প্রতিদিন সামনে আসছে যুদ্ধের আরও ভয়াবহ চিহ্ন। কোথাও চাপা পড়ে আছে মানুষের শেষ স্মৃতি, কোথাও এখনও মিলতে পারে প্রিয়জনের মরদেহ, আবার কোথাও ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বিস্ফোরিত না হওয়া বোমা। গাজায় এখন জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, তার নিচে এখনও ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে। ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান।
গাজার তেল আল-হাওয়া এলাকায় একটি রাস্তার সামান্য অংশ পরিষ্কার করতেই পুরো দিন কেটে যাচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হয়ে সেখানে কাজ করছেন জাতিসংঘের প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান। তার কথায়, এই কাজ যেন চামচ দিয়ে সমুদ্র খালি করার চেষ্টা। একসময়ের ব্যস্ত বেইরুট স্ট্রিট এখন প্রায় জনশূন্য। রাস্তার দুইপাশে ভেঙে পড়া দোকান, বাড়ি ও অফিসের স্তূপ। ক্ষতিগ্রস্ত নিকাশি ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে কোথাও কোথাও রাস্তায় বেরিয়ে আসছে নোংরা পানি। একটি বহুতল ভবনও ভিতের ক্ষতির কারণে হেলে আছে। জাতিসংঘের হিসাবে, গাজার মূল ধ্বংসস্তূপ সরাতেই অন্তত সাত থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। খরচ হতে পারে কয়েকশো কোটি ডলার। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্যালেস্টাইন প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানিয়েছেন যে, গাজার ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ গত ১৮ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধ থেকে তৈরি মোট ধ্বংসাবশেষের প্রায় ২০ গুণ।
এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ টনেরও বেশি পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট ধ্বংসাবশেষের মাত্র প্রায় দেড় শতাংশ সরানো সম্ভব হয়েছে। প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার হওয়ায় ত্রাণবাহী গাড়ি, উদ্ধারকারী দল এবং স্থানীয় মানুষের চলাচল কিছুটা সহজ হয়েছে। কিন্তু কাজটি মোটেই নিরাপদ নয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষের দেহাবশেষের পাশাপাশি রয়েছে বিস্ফোরিত না হওয়া বোমা ও অন্যান্য বিপজ্জনক বস্তু। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হিসাবে, এখনও ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক রেডক্রসসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে মিলে সম্ভাব্য মরদেহের অবস্থান চিহ্নিত করা হচ্ছে। পরিচয় শনাক্ত করা, ধর্মীয় রীতি মেনে দাফনের ব্যবস্থা এবং পরিবারের হাতে প্রয়োজনীয় নথি তুলে দেওয়াও এই কাজের অংশ।
ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিনের তেল ও অন্যান্য সামগ্রীরও তীব্র ঘাটতি রয়েছে। গাজায় নির্মাণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ঢোকানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা বাধা। ফলে আগে থেকেই থাকা পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি গাজায় পাঁচটি ধ্বংসস্তূপ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র পরিচালনা করছে। সেখানে সাতটি যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি যন্ত্র গত এক বছরে গাজার স্থানীয় প্রকৌশলীরা নিজেদের মতো করে মেরামত করে সচল করেছেন। ভাঙা কংক্রিট প্রথমে বাছাই করে ধাতু ও লোহার অংশ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। পরে তা ছোট ছোট টুকরোয় পরিণত করা হচ্ছে। সেই উপাদান দিয়েই রাস্তার গর্ত ভরাট, রাস্তা মেরামত এবং তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ের নিচে জায়গা উঁচু করার কাজ চলছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মী নেহাল আবু হাসান জানিয়েছেন যে , এসব উপাদানের মান স্বাভাবিক নির্মাণ সামগ্রীর মতো নয়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে অন্য কোনও পথও নেই।
ধ্বংসস্তূপ সরানোর ফলে গাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও কিছুটা পরিবর্তন আসছে। রাস্তা পরিষ্কার হওয়ায় যান চলাচল সহজ হয়েছে, ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্রব কমেছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দেওয়ার পর কিছু দোকান ও ছোট ব্যবসাও আবার খুলতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে , ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সামনে থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানোর পর প্রায় ২০ দিনের মধ্যেই অনেক ব্যবসা আবার চালু হয়েছে। তবে ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি স্তূপ গাজার মানুষের কাছে শুধু ইট আর পাথর নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বাড়ি, একটি পরিবার, বহু বছরের জমানো স্মৃতি। কোনও কোনও জায়গায় এখনও প্রিয়জনের মরদেহ চাপা থাকার আশঙ্কা। গাজায় ২১ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এই ধ্বংসস্তূপ।
এর মধ্যেই রয়েছে আরও নানারকম বিপদ। ধ্বংসস্তূপে অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে, যার তন্তু শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকলে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলিও বড় বিপদের কারণ। বাইরে থেকে কোনও বাড়ি নিরাপদ মনে হলেও দুর্বল কাঠামো আচমকা ভেঙে পড়তে পারে। তাই গাজায় পুনর্গঠনের পথে শুধু ধ্বংসস্তূপ সরানোই একমাত্র কাজ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নিরাপত্তা যাচাই করা, মৃতদেহ উদ্ধার, বিস্ফোরক শনাক্ত করা এবং মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি সবকিছুই এখন একসঙ্গে গাজার বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, প্রাথমিক পুনরুদ্ধারের কাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও পরিষেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই যতটা সম্ভব কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।



