হরমুজে যুদ্ধ কেন উপসাগরীয় জলসীমার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে?

৬ আগস্ট ওমানের উপকূলের সাগরে ক্ষতিগ্রস্ত ও আংশিক ডুবে থাকা তেলবাহী ট্যাংকার ক্যারোলিন বেজেঙ্গি। ছবি: রয়টার্স
ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এখন শুধু স্থল বা আকাশেই সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে একের পর এক হামলা হচ্ছে। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। এর জবাবে জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান।
এর মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এর আগে হরমুজ প্রণালির কাছে থাকা একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও নৌবাহিনীর একটি ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান।
পরে ইরানও জানায়, হরমুজ প্রণালিতে ‘অননুমোদিত পথে’ চলা তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে তারা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও তিনটি জাহাজেও হামলা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে হামলা-পাল্টা হামলায় এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তেলদূষণ। প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। কোনো তেলবাহী ট্যাংকারে বড় ধরনের হামলা হলে আগুন, জাহাজডুবি কিংবা ভয়াবহ তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
হরমুজে আটকা তেলবাহী জাহাজ
গত সোমবারের মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রণালিটি দিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল ৪২টি তেলবাহী ট্যাংকার। এর মধ্যে ১৮টি তেল বহন করছিল। এ ছাড়া বৃহত্তর ওমান উপসাগর ও আশপাশের এলাকায় আরও শত শত জাহাজ অপেক্ষা করছে বা ধীরগতিতে চলছে।
জাহাজগুলোতে ঠিক কত পরিমাণ তেল রয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে ট্যাংকারগুলোর সম্মিলিত তেল ও জ্বালানি বহনের সক্ষমতা প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার।
এই পরিমাণ তেল প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ ব্যারেলের সমান, যা বিশ্বের এক দিনের মোট তেল চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশ। প্রায় ৭১৪টি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুলও এই পরিমাণ তেল দিয়ে ভরানো সম্ভব।
কোনো বড় তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা বা জাহাজডুবির ঘটনা ঘটলে উপসাগরে লাখ লাখ লিটার তেল ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে উপকূল, মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়া তেল স্রোত ও বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত বড় এলাকায় ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে দূষণের প্রভাব হামলার মূল স্থান থেকে অনেক দূরের উপকূলেও পৌঁছে যেতে পারে।
কত জাহাজে হামলা হয়েছে?
৫ সেপ্টেম্বর সেন্টকম জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এর একটি ছিল ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে, একটি জাস্কের কাছে এবং অন্যটি ওমান উপসাগরে। তৃতীয় ট্যাংকারটি খালি ছিল এবং এর নাবিকদের জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৭৫টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। হামলার মধ্যে দুটি ঘটনায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে এবং ছয়টি ঘটনায় আগুন লেগেছে।
ওমানের উপকূলেও এরই মধ্যে তেল ছড়িয়ে পড়ছে। জুনের শুরুতে বিস্ফোরণের আশঙ্কার পর ক্যারোলিন বেজেঙ্গি নামের একটি ট্যাংকার ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দূরে আটকা পড়ে। এরপর জাহাজটি থেকে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। রয়টার্সের হিসাবে ট্যাংকারটিতে প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল তেল ছিল।
ওমানের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে, এই তেল ছড়িয়ে পড়লে রাস মাদরাকার কাছে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উপকূল ও মাসিরাহ দ্বীপ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৩ আগস্ট মিনোয়ান পাইওনিয়ার নামের লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি বাল্ক ক্যারিয়ার অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। পরে স্যাটেলাইট ছবিতে কেশম ও সিররি দ্বীপের কাছে তেলের স্তর দেখা যায়।
সিররি দ্বীপের কাছেও আরেকটি তেলের স্তর শনাক্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, কেশমের কাছের তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি মিনোয়ান পাইওনিয়ার থেকে ঘটতে পারে। তবে তারা স্বাধীনভাবে এর উৎস নিশ্চিত করতে পারেননি।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে কী প্রভাব পড়বে?
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান কেন্দ্রের গবেষক ফারেস আল-মোমানি ও পন্নুমনি ভেথামনি জানান, ১৯৮০-এর দশক থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলদূষণ বড় পরিবেশগত সমস্যা তৈরি করছে। শিল্পায়ন ও উপকূলীয় এলাকায় নানা স্থাপনা বাড়ায় সমুদ্রের ওপর মানুষের চাপও বেড়েছে।
ই-মেইলে তারা বলেন, অর্থনৈতিক ও শিল্পোন্নয়নের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। উপকূলে লবণমুক্ত পানি উৎপাদন কেন্দ্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল উত্তোলন স্থাপনা ও শোধনাগারসহ নানা অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। ফলে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে উপসাগরের সামুদ্রিক পরিবেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যুদ্ধের কারণেও এই অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবেশদূষণ হয়েছে। এর বড় উদাহরণ ১৯৯১ সালের ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’। কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনী পিছু হটার সময় দেশটির তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। মাসের পর মাস এসব কূপ জ্বলতে থাকে। এতে বিপুল পরিমাণ তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে।
এর প্রভাব পড়ে কুয়েত ও সৌদি আরবের উপকূলে। দক্ষিণ কুয়েত থেকে সৌদি আরবের আবু আলী দ্বীপ পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটারের বেশি উপকূল তেল ও আলকাতরায় ঢেকে যায়। এতে সামুদ্রিক প্রাণী ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আল-মোমানি ও ভেথামনি বলেন, তেলের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, তখন পরিবেশ পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেয়ে ক্ষতি কমানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হয়েছিল।
৩৫ বছর পর আবারও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে উপসাগরের নাজুক সামুদ্রিক পরিবেশ হুমকিতে পড়েছে। ইরানের উপকূলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাল্টা হামলায় বিভিন্ন দেশের জাহাজ ও ট্যাংকারও আক্রান্ত হচ্ছে। এতে নতুন করে তেলদূষণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তেলদূষণে বিপন্ন মাছ, প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণী
জুনে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার এক গবেষণায় স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মার্চে উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চার গুণ বেশি ছিল।
গবেষকরা জানান, হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে আটকে থাকা জাহাজগুলো থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বেড়েছে।
সমুদ্রের পানির ওপর ভেসে থাকা তেল সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি করে, পানি দূষিত করে এবং প্রবালপ্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ বনকে ঢেকে ফেলে।
বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ ও লবণাক্ত সামুদ্রিক পরিবেশের মধ্যেও উপসাগরে প্রবালপ্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ বন টিকে আছে। এটি অগভীর ও প্রায় বদ্ধ একটি সমুদ্রাঞ্চল। এখানে প্রবালপ্রাচীর, সামুদ্রিক ঘাস, ম্যানগ্রোভ, কাদামাটির চর ও লবণাক্ত জলাভূমি রয়েছে।
এসব এলাকা মাছ, কচ্ছপ, ডুগং ও পরিযায়ী পাখির খাবার ও প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একই সঙ্গে এগুলো মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও উপকূলকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভারত মহাসাগরের সঙ্গে উপসাগরের পানির আদান-প্রদান সীমিত। ফলে দূষণ ছড়িয়ে পড়লে এখানকার সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হুসেইন সামহ আল-মাসরুরি বলেন, তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ মাছ, প্রবাল, প্ল্যাংকটনসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। মাছের ডিম ও লার্ভা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে। তেলদূষণে মাছের বিচরণ, প্রজনন ও খাদ্যশৃঙ্খলেও পরিবর্তন আসতে পারে। এতে মৎস্যজীবীদের আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লবণমুক্ত পানিতেও ঝুঁকি
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ পানির জন্য সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইরানের দক্ষিণ উপকূলেও রয়েছে একাধিক লবণমুক্ত পানি উৎপাদন কেন্দ্র। এর কিছু স্থাপনাও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আওতায় এসেছে।
ইরানের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় দেড় কোটি মানুষ বসবাস করে।
আল-মাসরুরি বলেন, সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়লে লবণমুক্ত পানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর কাঁচা পানির মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে পরিশোধন প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হয়ে গুরুতর পরিস্থিতিতে কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত করতে হতে পারে।
তবে ঝুঁকি নির্ভর করে তেল ছড়িয়ে পড়ার স্থান, পানির স্রোত, কেন্দ্রের দূরত্ব ও ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর। আধুনিক পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস ব্যবস্থা ঝুঁকি কমাতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত তেলদূষণ শনাক্ত করে দূষিত পানি কেন্দ্রে ঢোকার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া।
সূত্র : আলজাজিরা






