যুদ্ধের ছয় মাসে বদলে গেছে ইরান, বোমার চেয়ে বড় ভয় ক্ষুধা
- যুদ্ধে জিতছে কে জানা নেই, হারছে সাধারণ মানুষ

ছয় মাস আগে যুদ্ধের আতঙ্ক ছিল সীমান্তে, সামরিক ঘাঁটিতে। এখন সেই যুদ্ধ ঢুকে পড়েছে ইরানের ঘরে ঘরে। বাজার, পেট্রলপাম্প, কর্মক্ষেত্র— জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাপ ফেলেছে দীর্ঘ সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধের পর ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় লড়াই এখন বেঁচে থাকার।
যুদ্ধের ময়দানে কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে তার হিসাব চলছে কূটনৈতিক মহলে। কিন্তু ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নটা অন্য। প্রতিদিনের বাজার খরচ কীভাবে সামলাবেন, পরিবারের জন্য খাবার জোগাবেন কীভাবে, আগামী মাসের ভাড়া দেবেন কীভাবে— এখন সে চিন্তাই সবচেয়ে বড়।
গতকাল রবিবার আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের আগস্টে ইরানের মূল্যস্ফীতি এক বছর আগের তুলনায় ৮৯ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে আরও দ্রুত। খাদ্য মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ১২৭ শতাংশের বেশি। ফলে বহু পরিবার প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ এবং অন্যান্য পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে।
তেহরানের একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মকর্তা বিজান আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে তার মাসিক আয় ১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের সমান ছিল। কিন্তু লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নে সেই আয়ের প্রকৃত মূল্য অনেকটাই কমে গেছে।
বাজারে আগুন, পকেটে চাপ
যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরানের অর্থনীতি ছিল চাপে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে বাধা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতার কারণে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘদিনের। ছয় মাসের সংঘাত সে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।
ইরানি মুদ্রা রিয়ালের পতনও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে খোলাবাজারে এক মার্কিন ডলারের বিনিময়ে প্রায় ২০ লাখ রিয়ালের বেশি লেনদেন হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর প্রভাব পড়েছে খাবার, ওষুধ, বাড়ি ভাড়া ও পরিবহন খরচে। অনেক পরিবার আগের তুলনায় কম কেনাকাটা করছে, প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা পিছিয়ে দিচ্ছে অথবা অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজছে।
তেল আছে, তবু পেট্রলের সংকট
বিশ্বের অন্যতম তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরান জ্বালানি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং পরিশোধনাগারে হামলার কারণে পেট্রল সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের পেট্রলপাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। সরকার জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং ভর্তুকি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয় বিবেচনা করছে। তবে অতীতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। ফলে যুদ্ধকালে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
চাপ স্বীকার, কিন্তু পিছু নয়
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলেছে। তার বক্তব্য, ইরান বর্তমানে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির’ মধ্যে রয়েছে। তবে তেহরান জানিয়েছে, অর্থনৈতিক চাপের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করবে না। ইরানের নেতৃত্বের দাবি, কূটনৈতিক পথ খোলা থাকলেও দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখা হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন।
যুদ্ধের ক্ষত শুধু অর্থনীতিতে নয়
ছয় মাসের সংঘাত শুধু বাজার বা অর্থনীতিতে আঘাত করেনি, মানুষের মানসিক জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিমান হামলার ভয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন বহু পরিবারের নিত্যসঙ্গী।
বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের জীবন সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে। শিক্ষা, কর্মজীবন এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবন বারবার ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে চাপের মধ্যে ফেললেও দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো এখনো টিকে রয়েছে। কিন্তু সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
ছয় মাস আগে শুরু হওয়া সংঘাত এখন আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লড়াই নয়। যুদ্ধে জিতছে কে, তার উত্তর হয়তো ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু আপাতত নিশ্চিত, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি হারছে ইরানের সাধারণ মানুষ।







