মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে আরও ৯ হাজার, মোতায়েন তৃতীয় রণতরীও

ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশের জলসীমায় তৃতীয় একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। আলজাজিরাকে তিনি এ কথা বলেছেন। গালফ নিউজে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৯ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনাকে যুদ্ধজাহাজের একটি বহর নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। এটি দেশটির বড় ধরনের নৌবাহিনী মোতায়েনের অংশ। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর উপসাগরীয় অঞ্চল ও আরব সাগরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ নৌবাহিনী মোতায়েনের ঘটনা।
ওই কর্মকর্তা আলজাজিরাকে জানান, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ রবিবার সান দিয়েগো ঘাঁটি ছেড়ে ওই অঞ্চলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এর এক দিন পর ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা নিয়ে মাকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও রওনা হয়েছে।
কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের আশপাশে তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দুটি উভচর অবতরণকারী নৌবহর অবস্থান করবে।
তিনি বলেন, এভাবে সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত বিকল্প থাকবে।
ওয়াশিংটন থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানান, নতুন মোতায়েনে হাজারো সেনা এবং অতিরিক্ত বিমানশক্তি রয়েছে, যার মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর সঙ্গে ওই অঞ্চলে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনাও রয়েছে।
পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে নুরি বলেছেন, কূটনীতি যেদিকেই এগোক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক বিকল্প ‘টেবিলে’ রাখাই এই মোতায়েনের লক্ষ্য। ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও পেন্টাগন কোনো সামরিক সম্পদ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে না। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ট্রাম্প নতুন করে হামলার নির্দেশ দিলে বাহিনী ‘প্রস্তুত’ রয়েছে।
ট্রাম্প নিজেও প্রকাশ্যে হামলার হুমকি বজায় রেখেছেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ বিজয় হবে বলে তিনি মনে করেন। তবে অন্য বক্তব্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সামরিক অভিযান আবার শুরু করা ‘সম্ভব’। যদিও নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে তিনি চান না।
সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি ওয়াশিংটন নতুন অর্থনৈতিক চাপও প্রয়োগ করছে। চলতি সপ্তাহে ইরানের রেল ও গাড়ি শিল্পের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, নতুন এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য তেহরানের অবশিষ্ট রাজস্বের উৎস শুকিয়ে দেওয়া।
কূটনৈতিক উদ্যোগ
সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ইরান কাতারের মাধ্যমে সাত দিনের একটি রোডম্যাপের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং লেবানন ও ইয়েমেনকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরুর কথা বলা হয়েছে।
তবে ট্রাম্প ওই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এনবিসিকে বলেছেন, আটকে রাখা তহবিল ছাড় এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বললেন, ‘এগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নয়… এগুলো বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা।’ ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাতটি প্রস্তাবের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে ইরানের প্রতিক্রিয়াতেও একই ধরনের দ্বিমুখী অবস্থান দেখা যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এনবিসিকে বলেছেন, তেহরান ‘যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে পুরোপুরি প্রস্তুত’। পরে এক্সে তিনি লেখেন, ‘আমরা যুদ্ধ বিক্রি করতে নিউইয়র্কে আসিনি। আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এসেছি।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরস্পরবিরোধী বার্তা ইচ্ছাকৃত।
সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের আব্বাস আসলানি বলেন, বিরোধটি এখন আলোচনায় বসা হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে সরে গিয়ে ‘কে প্রথমে মূল দর-কষাকষির হাতিয়ার ছেড়ে দেবে’—সেই প্রশ্নে গিয়ে ঠেকেছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রিচার্ড শ্মিয়ারার বলেন, ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া এবং জুনের চুক্তির মতো ছাড় দেওয়ার রাজনৈতিক মূল্য এই দুইয়ের মধ্যে আটকে আছেন।
এদিকে নতুন এক এপি-নরসি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন বলছেন, এই যুদ্ধ করা মূল্যবান ছিল না। নিজের জনপ্রিয়তার অনুমোদন কমে যাওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ‘জরিপকারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত।’
সূত্র: আলজাজিরা, গালফ নিউজ



