ইরানে আবার যুদ্ধাপরাধ যুক্তরাষ্ট্রের
- বিয়েবাড়িতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ; নিহত দুই শিশুসহ চারজন ,আহত ৬৭
- ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারায় ১৬৮ শিশু
- ইরানের পাশে ‘পূর্ণ সংহতি’ পুতিনের, ‘সাম্রাজ্যবাদের হাঙর’ গিলে খেতে এলে দাঁতে ঘুষি দেবে রাশিয়া

বিয়ে বাড়িতে হামলায় আহত এক শিশু ও পুরুষ। ছবি- রয়টার্স
ফারসি কবি সাদির বহু পুরোনো বাণী, ‘মানুষ একই দেহের অঙ্গ ’। অর্থাৎ একই মানব সমাজের অংশ পৃথিবীর সব মানুষ। একজনের ব্যাথায় ব্যাথিত হবে অন্যরাও। কিন্তু বিশ্ব মোড়ল মসনদের ‘মোগল’ যুক্তরাষ্ট্রের সে অনুভিূতি নেই ! গত মঙ্গলবার আবারও হামলা চালিয়েছে ইরানের বেসামরিক জনপদে। আনন্দঘন বিয়ে বাড়িতে ! মুহুর্তেই রক্তে ভেসে যায় নতুন জীবনের স্বপ্ন। যেখানে থাকার কথা ছিল গান, আলো আর নবদম্পতির হাসি, সেখানে পরদিন দেখা গেল ভাঙা ছাদ, ছড়িয়ে থাকা ফুলের মালা আর নারী-শিশুদের জুতো। তাসনিম নিউজ ,দ্য গার্ডিয়ান ও আল জাজিরার প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও ফুটেজেও উঠে এসেছে সেই ধ্বংসের দৃশ্য। এই হামলাকে ‘নৃশংস যুদ্ধাপরাধ’ বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
ইরানের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাকে একটি বাড়িতে চলা বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলা আঘাত হানে। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে পাঠানো চিঠির সর্বশেষ হিসাবে চারজন নিহত এবং অন্তত ৬৭ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চার ও ১৬ বছর বয়সী দুই শিশু রয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট স্বাধীন তদন্ত দাবি করে বলেছে, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু প্রমাণিত হলে ঘটনাটি যুদ্ধাপরাধ হতে পারে।
ভিডিওতে বাড়িটির ছাদে বড় গর্ত, ভেতরে ধ্বংসস্তূপ, বিয়ের সাজসজ্জা এবং শিশুদের জুতো দেখা গেছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, একই রাতে ওই এলাকায় একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। রয়টার্সের যাচাই করা দৃশ্যেও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির অবস্থান সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সঙ্গে মিলে গেছে।
বুধবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই একে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, তাদের সর্বশেষ হামলার লক্ষ্য ছিল বিপ্লবী গার্ডের বিমান প্রতিরক্ষা, রাডার, সামুদ্রিক ও যোগাযোগ অবকাঠামো। কুহেস্তাকের বিয়েবাড়িটি ইচ্ছাকৃত লক্ষ্য ছিল কি না, তা এখনও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
এই ঘটনা ফিরিয়ে এনেছে ছয় মাস আগের আরেক ভয়াবহ স্মৃতি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একই হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৮ শিশু নিহত হয়েছিল বলে ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য৷ নিহতদের অধিকাংশ ছিল কন্যা শিশু। ইউনিসেফও ৫ মার্চ ১৬৮ শিশুর মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক তদন্তকারীদের প্রাথমিক মূল্যায়নে হামলাটির জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী হওয়ার সম্ভাবনা পাওয়া গেছে; তবে তদন্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনও ঘটনাটি তদন্ত করছে।
এর মধ্যেই তেহরানের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মঙ্গলবার কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছেন, রাশিয়া ইরানি জনগণের সঙ্গে ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পণ্য সরবরাহ করছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মস্কো তেহরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও ড্রোনের যন্ত্রাংশসহ সহায়তা দিয়েছে।
একই সফরের সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমা শক্তিকে সোভিয়েত যুগের ‘সাম্রাজ্যবাদের হাঙর’-এর সঙ্গে তুলনা করে পুতিন বলেছেন, কেউ রাশিয়াকে গিলে খেতে চাইলে তার ‘দাঁতে ঘুষি’ পড়বে। মন্তব্যটি ইরান প্রসঙ্গে সরাসরি নয়, তবে পশ্চিমাদের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নে মস্কোর কঠোর অবস্থানেরই ইঙ্গিত।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার দাবি করেছে। ওয়াশিংটন হতাহতের দাবি অস্বীকার করেছে। এতে ফের তীব্র হয়েছে ছয় মাসের সংঘাত।
ছয় মাস আগে মিনাবে স্কুলের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিল শিশুদের জীবন; এবার কুহেস্তাকে বিয়ের মালার পাশে পড়ে রইল ছোট ছোট জুতো। যুদ্ধের মানচিত্রে জায়গা বদলায়, লক্ষ্য বদলায় কিন্তু শোকের মুখটি বারবার একই থেকে যায়।





