বসন্ত এলেই হাঁচিতে কাঁপে জাপান, কিন্তু কেন?

সংগৃহীত ছবি
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে কিছু ভিডিও। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, পাহাড়ঘেরা বিশাল সবুজ বন থেকে ধোঁয়ার ঢেউ উঠছে আকাশে। কেউ ভাবছিল আগুন লেগেছে, কেউ বলছিল কুয়াশা। কিন্তু আসলে সেগুলো ধোঁয়া ছিল না। ওগুলো ছিল পরাগরেণু।
জাপানের পাহাড় জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোটি কোটি গাছ একসঙ্গে বাতাসে ছেড়ে দিচ্ছিল হলদে রঙের সূক্ষ্ম পরাগরেণু। আর সেই দৃশ্য যেন পুরো দেশের জন্য এক অঘোষিত সতর্কবার্তা—বসন্ত চলে এসেছে। এবার শুরু হবে হাঁচি, চোখ চুলকানো আর অ্যালার্জির মৌসুম।
আজকের জাপানে বসন্ত মানেই শুধু চেরি ফুল নয়, বসন্ত মানেই মাস্ক। বসন্ত মানেই নাক দিয়ে পানি পড়া। ট্রেনের ভেতর একসঙ্গে কয়েকজনের হাঁচির শব্দ।
টোকিওর ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটলে দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়া শিশু থেকে অফিসফেরত বৃদ্ধ—সবার মুখে মাস্ক। কেউ চোখ মুছছেন, কেউ নাক চেপে ধরে হাঁটছেন। অনেকের চোখ লাল হয়ে আছে। কেউ কেউ ছোট ছোট স্প্রে বোতল হাতে নিয়ে ঘুরছেন। একসময় বসন্ত ছিল জাপানের সবচেয়ে সুন্দর ঋতু। এখন সেটিই অনেকের কাছে বছরের সবচেয়ে কষ্টের সময়।
বিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, জাপানের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ মাঝারি থেকে তীব্র অ্যালার্জিতে ভোগেন। তুলনায় যুক্তরাজ্যে এই হার ২৬ শতাংশ আর যুক্তরাষ্ট্রে ১২ থেকে ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপান এখন মৌসুমি অ্যালার্জির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একটি। এটি শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, অর্থনীতির সমস্যাও।
তাপমাত্রা ও বাতাসের পরিবর্তনের সঙ্গে পরাগরেণুর সম্পর্ক খুব গভীর। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯৬০ সালের আগে জাপানি ভাষায় ‘হে ফিভার’-এর কোনো শব্দই ছিল না
অ্যালার্জির কারণে মানুষ ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। কাজে মনোযোগ কমে যায়। অনেকে অসুস্থ হয়ে ছুটি নেন। গবেষণায় দেখা গেছে, হে ফিভারের মৌসুমে জাপানের অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—জাপানের মানুষ এত অ্যালার্জিতে ভুগছে কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রায় ৭০ বছর আগে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ছিল এক বিধ্বস্ত দেশ। যুদ্ধের সময় জ্বালানির সংকটে পড়ে দেশটি ব্যাপক হারে বন কেটে ফেলেছিল। পাহাড়ের গাছ ব্যবহার করা হয়েছিল ঘর গরম রাখতে। এছাড়া কারখানা চালাতে ও মানুষের বেঁচে থাকার জন্য। ফলে টোকিও, ওসাকা, কোবে শহরের আশপাশের পাহাড়গুলো প্রায় ন্যাড়া হয়ে যায়। গাছ না থাকায় শুরু হয় নতুন বিপদ। পাহাড় ধসে পড়তে থাকে। বন্যা বাড়ে। মাটির ক্ষয় শুরু হয়।
তখন জাপান সরকার সিদ্ধান্ত নেয়—দ্রুত বন ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু দ্রুত বন তৈরির জন্য তারা বেছে নেয় সবচেয়ে সহজ পথ। দেশজুড়ে লাগানো শুরু হয় মাত্র দুই ধরনের দ্রুতবর্ধনশীল গাছ— সুগি ও হিনোকি। সুগি হলো জাপানি সিডার আর হিনোকি এক ধরনের জাপানি সাইপ্রেস। এই গাছগুলো দ্রুত বড় হয়, কাঠ দেয় আবার পাহাড়ও ধরে রাখে। সরকারের কাছে তখন এটিই ছিল সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। কেউ ভাবেনি, কয়েক দশক পরে সেই সিদ্ধান্তই কোটি মানুষের বসন্ত কেড়ে নেবে।
আজ জাপানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জমি জুড়ে রয়েছে এই সুগি ও হিনোকির বন। সমস্যা হলো, এই গাছগুলো বিপুল পরিমাণ হালকা পরাগরেণু তৈরি করে। বসন্তে বাতাসে সেই পরাগরেণু একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে শহরে, বাড়িতে এবং মানুষের ফুসফুসে। আর এখন প্রায় সব গাছই ৩০ বছরের বেশি পুরোনো। অর্থাৎ তারা আগের চেয়ে আরও বেশি পরাগরেণু ছড়াচ্ছে।
নোরিকো সাতো বলছেন,‘পরাগরেণুর অ্যালার্জি এখন জাপানের জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।’
২০২৩ সালে জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যালার্জিকে ‘জাতীয় সামাজিক সমস্যা’ ঘোষণা করে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়—আগামী ৩০ বছরে পরাগরেণুর মাত্রা অর্ধেকে নামিয়ে আনা। কিন্তু কাজটি সহজ নয়।
কারণ শুধু গাছ কেটে ফেললেই হবে না। নতুন বনও তৈরি করতে হবে। না হলে আবার পাহাড় ধসে পড়বে, মাটির ক্ষয় বাড়বে। সুগি বনের ভেতর হাঁটলে বোঝা যায়, সমস্যাটা শুধু অ্যালার্জি নয়।
সব গাছ প্রায় একই উচ্চতার। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। খুব কম পাখি দেখা যায়। পোকামাকড়ও কম। এ যেন প্রকৃতির বন নয়, মানুষের তৈরি কোনো সবুজ কারখানা।
অথচ জাপানের প্রাকৃতিক বন একেবারেই আলাদা। সেখানে নানা ধরনের গাছ, পাখির ডাক, ছোট প্রাণীর ছুটোছুটি—সব মিলিয়ে জীবন্ত এক পরিবেশ।
ধীরে ধীরে কিছু শহর সেই পুরোনো বন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেছে। কোবে শহর ২০২০ সালে একটি বড় প্রকল্প শুরু করে। সেখানে সুগি ও হিনোকির বন কেটে আবার প্রাকৃতিক চওড়া পাতার বন তৈরি করা হচ্ছে। সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাতে শুরু করলে নতুন গাছ জন্ম নিচ্ছে। পাখিরা বীজ এনে ফেলছে। প্রাণীরা ফিরে আসছে।
কোবের পরিবেশ কর্মকর্তা আতসুশি ওকাদা বলছেন, ‘আমরা অবাক হয়েছি, জীববৈচিত্র্য এত দ্রুত ফিরে আসছে দেখে।’
এখন সেখানে ব্যাঙ, কচ্ছপ, বিরল পোকামাকড়—এমনকি ব্যাজারও দেখা যাচ্ছে। তবে পুরো জাপানের বন বদলে ফেলা বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। তাই বিজ্ঞানীরা অন্য পথও খুঁজছেন।
দেশজুড়ে বসানো হয়েছে বিশেষ রোবট, যেগুলো বাতাসে পরাগরেণুর মাত্রা মাপতে পারে। তাদের চোখের রং বদলে যায় বাতাসের অবস্থার ওপর নির্ভর করে। নতুন ওষুধও তৈরি হচ্ছে। এমনকি বিজ্ঞানীরা এমন চাল নিয়েও গবেষণা করছেন, যা অ্যালার্জির উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কিন্তু এর মধ্যেই নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন।
উষ্ণতা বাড়ায় এখন জাপানে বসন্ত আগের চেয়ে আরও দ্রুত আসছে। ফলে পরাগরেণুও আগেভাগে ছড়াতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালে দেশটি ইতিহাসের সবচেয়ে আগাম পরাগরেণু ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেখেছে।
আবহাওয়াবিদ মাই সাতো বলছেন, ‘তাপমাত্রা ও বাতাসের পরিবর্তনের সঙ্গে পরাগরেণুর সম্পর্ক খুব গভীর। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯৬০ সালের আগে জাপানি ভাষায় ‘হে ফিভার’-এর কোনো শব্দই ছিল না।’
১৯৬৩ সালে প্রথমবার ‘জাপানি সিডার পলিনোসিস’ শনাক্ত হয়। তখন চিকিৎসকেরা এটিকে একেবারে নতুন রোগ হিসেবে দেখেছিলেন। আজ সেই রোগই পুরো দেশের বসন্তকে বদলে দিয়েছে।
শুধু অ্যালার্জির কথা ভাবলে হবে না। বনকে ঘিরে আগামী ৫০ বা ১০০ বছরের ভবিষ্যৎও ভাবতে হবে। মানুষ, প্রকৃতি আর জলবায়ু— সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই বন পরিকল্পনা করতে হবে
তবু আশা হারাচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা। তাদের বিশ্বাস, একদিন জাপানের মানুষ আবার মাস্ক ছাড়া বসন্তের বাতাস নিতে পারবে। চেরি ফুলের নিচে দাঁড়িয়ে হাঁচি নয়, শুধু ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করবে। আর হয়তো সেই দিন জাপানের পাহাড়গুলোও আবার সত্যিকারের জীবন্ত বনে ভরে উঠবে।
এদিকে জাপান সরকার এখন শুধু গাছ কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। তারা এমন নতুন সুগি গাছ তৈরি করার চেষ্টা করছে, যেগুলো খুব কম পরাগরেণু ছড়াবে— এমনকি কিছু গাছ প্রায় পরাগরেণুহীনও। শহরের আশপাশে নতুন করে যেসব গাছ লাগানো হচ্ছে, সেখানে এই কম-পরাগরেণুর চারা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নতুন গাছ লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ জাপানের বিশাল বনাঞ্চলের বেশিরভাগই এখন বয়স্ক গাছে ভরা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব গাছ আরও বেশি পরাগরেণু ছড়ায়। ফলে পুরোনো বন ব্যবস্থাপনা বদলানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অ্যালার্জির সমস্যা কমানো কঠিন।
অন্যদিকে বন কেটে ফেলারও ঝুঁকি আছে। কারণ এই বনগুলো বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে সাহায্য করছে। গবেষকেরা বলছেন, পুরোনো গাছ কেটে নতুন ও বৈচিত্র্যময় বন তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন অ্যালার্জি কমবে, অন্যদিকে বন আরও কার্যকরভাবে কার্বন শোষণ করতে পারবে।
জাপানের পরিবেশবিদ জুনিচি মিশিবা মনে করেন, শুধু অ্যালার্জির কথা ভাবলে হবে না। বনকে ঘিরে আগামী ৫০ বা ১০০ বছরের ভবিষ্যৎও ভাবতে হবে। তার ভাষ্য, ‘মানুষ, প্রকৃতি আর জলবায়ু— সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই বন পরিকল্পনা করতে হবে।’
তাই আজ জাপানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কীভাবে হাঁচি কমানো যায়, সেটি নয়। বরং কীভাবে এমন বন তৈরি করা যায়, যেখানে মানুষও সুস্থ থাকবে এবং প্রকৃতিও বাঁচবে। হয়তো সেই উত্তর খুঁজতেই নতুন করে নিজের পাহাড় আর বনকে চিনতে শুরু করেছে জাপান।













