ফিরে এসেছে বিষাক্ত শীতের বাতাস, কতটা প্রস্তুত দিল্লি?

প্রতি বছরের মতো এবারও দীর্ঘ কয়েক মাসের দূষণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন দিল্লিবাসী। ছবি : সংগৃহীত
শীতের আগমনীর সঙ্গে সঙ্গে আবারও ঘন হতে শুরু করেছে ভারতের রাজধানী দিল্লির দূষিত বাতাস। আকাশ জুড়ে ধূসর কুয়াশার মতো ধোঁয়া। বাতাসে পোড়া গন্ধ। বাসিন্দাদের চোখ জ্বালা, কাশি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যাও বাড়ছে।
প্রতি বছরের মতো এবারও দীর্ঘ কয়েক মাসের দূষণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন দিল্লিবাসী। বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে দীপাবলির সাজসজ্জার বাক্সের পাশে জায়গা করে নিয়েছে এয়ার পিউরিফায়ার।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, প্রতি শীতে ফিরে আসা এ ভয়াবহ দূষণ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত দিল্লি?
এবার দূষণের তীব্রতা বাড়ার আগেই শীতকালীন কর্মপরিকল্পণা ঘোষণা করেছে দিল্লি সরকার। ১ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ পরিকল্পনা কার্যকর থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা একে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
দিল্লির বাসিন্দা ও ৪৩ বছর বয়সী শিক্ষক মীনু রানার বসার ঘরে রাখা দুটি কার্ডবোর্ডের বাক্স। একটিতে দীপাবলির সাজসজ্জা ও ঝলমলে আলো। অন্যটিতে এয়ার পিউরিফায়ার।
তার ভাষ্য, সকাল থেকেই বাতাস ভারী ও অস্বস্তিকর লাগতে শুরু করেছে। সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা ভালো।
মীনু একা নন। প্রতি বছর শীত ও উৎসবের মৌসুম ঘনিয়ে এলে দিল্লির বাসিন্দারা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন দূষিত বাতাসে কয়েক মাস কাটানোর জন্য।
দিল্লি ও আশপাশের শহরগুলোয় সারা বছরই বিশ্বের সর্বোচ্চ দূষণের মাত্রাগুলোর কিছু রেকর্ড হয়। তবে শীত নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
তাপমাত্রা কমে গেলে এবং বাতাসের গতি ধীর হয়ে পড়লে দূষণের উপাদানগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার বদলে মাটির কাছাকাছি আটকে থাকে। প্রতিবেশী রাজ্যগুলোয় ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ধোঁয়া পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে।
এর সঙ্গে রয়েছে যানবাহন ও কারখানার ধোঁয়া এবং নির্মাণকাজের ধুলা। উৎসবের সময় আতশবাজির ব্যবহারও বায়ুর মান আরও খারাপ করে।
দূষণের সবচেয়ে খারাপ সময় আসার কয়েক মাস আগেই এবার শীতকালীন কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দিল্লি সরকার।
পরিকল্পনার আওতায় দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত পুরনো ও বেশি দূষণকারী যানবাহনের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ধুলা সৃষ্টি করে এমন ভাঙার কাজ ও খোলা জায়গায় নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোকে অর্ধেক কর্মীকে বাসা থেকে কাজের সুযোগ দিতে বলা হয়েছে।
সরকারি কর্মীদের জন্য অফিসের সময় ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। পার্কিং ফিও দ্বিগুণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দূষণ পর্যবেক্ষণ ও আইন প্রয়োগে জোরদার, গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে সরকার।
দূষণের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যানের (গ্র্যাপ) বিধিনিষেধ কঠোর হয়। বর্তমানে এর দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর রয়েছে। এর আওতায় ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার এবং কয়লা ও জ্বালানি কাঠ পোড়ানোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে-কলমে এসব উদ্যোগ দূষণ মোকাবিলার একটি রূপরেখা তৈরি করেছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।
জলবায়ু সমাধান নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ডের উপদেষ্টা পার্থ বোসু জানিয়েছেন, পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
দিল্লির দূষণ পরিস্থিতির সঙ্গে শহরের বাইরের ঘটনাও জড়িত। প্রতিবেশী রাজ্য ও উত্তর ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে দূষণকারী উপাদান বাতাসের সঙ্গে দিল্লিতে এসে পৌঁছায়।
ফলে শুধু দিল্লির নেওয়া পদক্ষেপ দিয়ে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। পার্থ বসুর মতে, এ সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেশী রাজ্য ও উত্তর ভারতের বৃহত্তর অঞ্চলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এরই মধ্যে প্রতিদিনই দূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে পড়ছেন দিল্লির বাসিন্দারা।
শীতকালে দিল্লির সরকারি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোয় প্রায়ই বায়ুর মান সূচক বা একিউআই ৩০০-এর ওপরে ওঠে। এই মাত্রাকে ‘খুবই খারাপ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিছু দিনে এই সূচক ৫০০-তে পৌঁছায়, যা ভারতের মানদণ্ডে সর্বোচ্চ।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ার কোনো কোনো দিন প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি মাত্রা রেকর্ড করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় গড় পিএম২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু দূষণের মৌসুমে দিল্লিতে এ মাত্রা প্রায়ই নির্ধারিত সীমার ২৫ গুণেরও বেশি থাকে।
দিল্লির কাছে অবস্থিত ফর্টিস মেমোরিয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পালমোনোলজি বিভাগের প্রধান ডা. মনোজ গোয়েল জানিয়েছেন, এই ক্ষুদ্র কণাগুলো ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে পৌঁছাতে পারে। এতে শরীরে প্রদাহ তৈরি হয় এবং একাধিক অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সূত্র : বিবিসি



