মোদিবিরোধী গণবিস্ফোরণের মুখে ভারত
- প্রধানমন্ত্রীর ‘পদত্যাগ চাই’ বিক্ষোভে আটকের কয়েক ঘণ্টা পরেই মুক্ত রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, অখিলেশ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে কংগ্রেসের বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহীত
ঝড় উঠছে ভারতে। বিক্ষোভের কালমেঘ ভর করেছে দেশটির রাজনৈতিক দিগন্তে। দিনে দিনে গণবিস্ফোরণে রূপ নিচ্ছে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের ভিত কাঁপিয়ে ভারত জুড়ে একযোগে বেজে উঠেছে গণজাগরণের রণভেরী। ছাত্র থেকে কৃষক, বিরোধী দল থেকে প্রবাসী— সবার মুখেই সরকারবিরোধী ক্ষোভ। কাকতালীয় হলো— সব স্রোত এক দিনে একই মোহনায় আছড়ে পড়েছে গতকাল। স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে উঠেছে দিল্লির রাজপথ। আগের দিন ককরোচের সংসদ ঘেরাও কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ, পরদিনই (মঙ্গলবার) গেরুয়া রত্ন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে কংগ্রেসের বিক্ষোভ। ঠিক তখনই পুবের আকাশ থেকে বিক্ষোভের নতুন মশাল জ্বালিয়ে সর্বভারতীয় আন্দোলনের ডাক দিলেন পশ্চিমবঙ্গের বাঘিনীকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফুঁসে উঠেছেন ভারতের অন্নদাতারাও। অধিকার আর আত্মসম্মান রক্ষার লড়াইয়ে ‘দিল্লি চলো’ আন্দোলনে রাজধানীর সীমানায় আরেক নতুন ইতিহাসের জন্ম দিলেন ক্ষুব্ধ কৃষকরাও। লন্ডনের ভারতীয় দূতাবাস ‘ইন্ডিয়া হাউজ’র সামনেও এদিন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন প্রবাসীরা। সব মিলে অভূতপূর্ব এক অশনিসংকেতে কাঁপছে মোদি সরকারের ভিত। দুলছে ভারতের রাজনীতি।
‘প্রশ্নফাঁস নটবর’ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মপ্রধানের পদত্যাগ দাবিতে গেড়ে বসা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ এখন আরও সহিংস পর্যায়ে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে ভুল করেনি বিরোধী দল কংগ্রেসও। জোট-শরিকদের নিয়ে দলবেঁধে ছুটে যায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে। ছাত্রদের ওপর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে বসে পড়েন নয়াদিল্লির ৭ লোক কল্যাণ মার্গে তার বাসভবনের সামনে। কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কে সি বেনুগোপাল, কেরলমের মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন ও কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারও অংশ নেন বিকালের সেই অবস্থানে। শীর্ষ নেতাদের ধরনায় বসার খবর জানাজানির পর দলে দলে হাজির হন কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবির স্লোগানে গুমোট করে তোলেন ‘পঞ্চবটী’র (বাসভবনের অফিসিয়াল নাম) হাওয়া। কংগ্রেস ছাড়াও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকরাও অংশ নেন ধরনায়। কংগ্রেসের আচমকা এ পদক্ষেপ হতচকিত করে ফেলে নিরাপত্তারক্ষীদের। বিরাট বহর নিয়ে ছুটে আসে পুলিশের বিশাল বহর। স্লোগানের মধ্যেই (স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা) রাহুল গান্ধীসহ নেতাদের আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। রাহুল গান্ধীকে ছত্রশাল স্টেডিয়ামে এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নিয়ে যায় মন্দির মার্গ থানায়। কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার পর রাতেই অন্যান্য নেতার সঙ্গে তাদের ছেড়ে দেয় দিল্লি পুলিশ।
ধরনার মধ্যেই (বিকাল ৪টা) রাহুল গান্ধী ‘এক্স’ হ্যান্ডল পোস্টে লেখেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এসে গেছি। গতকাল (সোমবার) ছাত্রদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের জবাব চাইতে এসেছি। এই সরকার কোনো দায় নিতে চায় না। তারা সংসদে বিতর্কও চায় না। দেশের যুব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার অপরাধে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।’ মোদিবিরোধী এই অসন্তোষে ঝোপ বুঝে কোপ মারলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। কলকাতার ২১ জুলাইয়ের শহীদ স্মরণ মঞ্চে বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার ডাক দিলেন মমতা।
বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার করার ডাক দেওয়ার পাশাপাশি দিল্লিতে চলা ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের প্রতিও সমর্থনের বার্তা দেন তিনি। একই সঙ্গে দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের উদ্দেশে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাদের জন্য আর তৃণমূলের দরজা খুলবে না।
দিল্লিমুখী
হাজারো কৃষক
দিল্লিতে
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যেই নতুন চাপ তৈরি করেছেন পাঞ্জাবের কৃষকরা।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘কিষান মহাপঞ্চায়েত’-এ
যোগ দিতে গতকাল হাজার হাজার কৃষক দিল্লির উদ্দেশে রওনা হলেও পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তেই
তাদের পথ আটকে দেয় হরিয়ানা পুলিশ। এতে দিল্লির চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় যোগ হয়েছে
নতুন মাত্রা। জানা গেছে, শম্ভু সীমান্তে পৌঁছানোর পর পাঞ্জাব থেকে আসা কৃষকদের সামনে
বিশাল ব্যারিকেড বসিয়ে তাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়া হয়। তবে আমবালা, কুরুক্ষেত্র
ও আশপাশের জেলা থেকে আসা হরিয়ানার কৃষকদের দিল্লিমুখী যাত্রায় কোনো বাধা দেওয়া হয়নি।
সীমান্তে এই কড়াকড়ি ২০২৪ সালের বহুল আলোচিত ‘দিল্লি চলো-২’ আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সে সময়ও রাজধানীতে কৃষকদের প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত জুড়ে সিমেন্টের ব্লক, লোহার পেরেক ও বহুস্তরীয় ব্যারিকেড বসিয়ে কার্যত পরিণত করা হয়েছিল দুর্গে।




