বিজেপির শাসনে বদলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যাভ্যাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যে খাবারটা এতদিন ছিল পশ্চিমবঙ্গের বহু মুসলিম পরিবারের অতি পরিচিত খাদ্যতালিকার অংশ, সেই গরুর মাংস এখন যেন ক্রমেই নাগালের বাইরে। কোথাও বাজারে মাংস মিলছে না, কোথাও মিললেও চড়া দাম। কসাইখানার দরজা বন্ধ, ব্যবসায়ীদের অনুমতিপত্র নবীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সরবরাহ ব্যবস্থায় টান। সব মিলিয়ে গত কয়েক মাসে বদলে গেছে পরিস্থিতি। তার প্রভাব পড়ছে শুধু গরুর মাংসের ব্যবসায় নয়; বহু পরিবারের রান্নাঘরেও। আগে যে পরিবারে সপ্তাহে পাঁচ-ছয় দিন গরুর মাংস রান্না হতো, সেখানে এখন সপ্তাহে এক দিনও জোটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কেউ সস্তার মাছ বা সবজিতে ভরসা করছেন, কেউ মুরগিতে। আলজাজিরা।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে কলকাতার ট্যাংরা। শহরের একমাত্র গবাদিপশুর কসাইখানার সামনে এখন দিনের ব্যস্ত সময়েও অস্বাভাবিক নীরবতা। মে মাসের পর থেকে সেখানে আগের মতো পশু জবাই বা মাংস সরবরাহের কাজ হচ্ছে না। মে মাসে কসাইখানার কাজ বন্ধ হওয়ার পর থেকেই পাঁচিল টপকে তারা সেখানে খেলতে ঢোকে বলে জানালেন উল্টো দিকের খাবারের দোকানের কর্মী মেহমুদ আলম। তার দোকানে মূলত দিনমজুর, ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকরা খেতে আসেন। কিন্তু এখন ক্রেতা কমেছে, মাংসের দাম বেড়েছে, আর আগের মতো ভালো মানের মাংসও নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না।
এই শূন্যতার সঙ্গে এখনো মানিয়ে নিতে পারছেন না আলম। তার কথায়, ‘আমার মনে হয় না, এই সরকার খুব তাড়াতাড়ি এটি ফের খুলতে দেবে।’
বিক্রি কমেছে, গরুর মাংসের স্টু-ও উধাও: গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে গবাদিপশু জবাই নিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। তার মাত্র চার দিন আগে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিশ্চিত হয়েছিল। শেষ হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসন। নতুন বিজ্ঞপ্তিতে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর এবং নির্দিষ্ট ধরনের মহিষ জবাই করতে হলে আগে জবাই যোগ্যতার শংসাপত্র নিতে হবে। ১৪ বছরের বেশি বয়স, কাজ বা প্রজননে অক্ষমতা, কিংবা বয়স, আঘাত, বিকৃতি বা দুরারোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হলেই সেই শংসাপত্র মিলবে। শংসাপত্র পাওয়া পশু জবাই করা যাবে শুধু পৌরসভা বা স্থানীয়ভাবে নির্দিষ্ট কসাইখানায়। প্রকাশ্য স্থানে জবাইও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মে মাসে ঈদের ঠিক আগে এই বিজ্ঞপ্তি আসায় কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বাজার ও রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসের সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়েও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসার অনুমতিপত্রের সমস্যা। মাংস সরবরাহকারীদের প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্রের নবীকরণও আটকে রয়েছে। জুনে কলকাতা পৌরসভা ভেঙে যাওয়ার পর মেয়র ফিরহাদ হাকিম পদ ছাড়েন। আগামী ডিসেম্বর মাসে কলকাতা পৌরভোট হওয়ার কথা।
মেহমুদের পাশে বসেছিলেন তার বন্ধু মুসতাক, যিনি মাংসের ব্যবসা করেন। তার পরিবারের ছয় প্রজন্ম কলকাতায় গরুর মাংস সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। তার কথায়, ‘আগের কোনো সরকারের আমলে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি। নির্বাচনের জন্য অনুমতিপত্র নবীকরণ বন্ধ হয়ে গেছে। কবে ফের হবে, সেটাও কেউ বলছে না। তিন মাসের বেশি সময় ধরে আমি এক পয়সাও আয় করতে পারিনি।’
আগে ১০০ টাকায় যে এক প্লেট গরুর মাংসের ভুনা মিলত, এখন তার দাম ১২০ টাকা। কলকাতায় এক কেজি গরুর মাংসের দাম এখন ৩৫০-৫০০ টাকা। মে মাসের আগে তা ছিল ২০০-২৫০ টাকা। অথচ দাম বাড়লেও মেহমুদের দোকানের বিক্রি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
তার মতে, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং মাংসের মান নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ক্রেতাদের একাংশের ভয়ও এর কারণ। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেতে দেখা যাওয়ায় অনেকে অস্বস্তি বোধ করছেন বলে তার ধারণা। বিশেষ করে যে হিন্দু তরুণরা নিয়মিত তার দোকানে গরুর মাংসের স্টু খেতে আসতেন, তাদের আর দেখা যাচ্ছে না।
খাদ্যতালিকায় গরুর মাংসের দীর্ঘ ইতিহাস: পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস খাওয়ার চল বহু দিনের। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার এবং ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শহুরে পরিবার গরু বা মহিষের মাংস খাওয়ার কথা জানিয়েছে। দেশের মধ্যে এই হার অন্যতম বেশি পাশের অাসাম এবং দক্ষিণের কেরালার সঙ্গেও পশ্চিমবঙ্গ এই তালিকায় রয়েছে। খ্রিস্টান, দলিত সম্প্রদায়ের একাংশ এবং কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকাতেও রয়েছে এই মাংস।
কাগজ-কলমে বন্ধ নয় ট্যাংরার কসাইখানা: আনুষ্ঠানিকভাবে ট্যাংরার কসাইখানা বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়নি। কিন্তু বাস্তবে সেখানে কাজকর্ম প্রায় নেই। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আধিকারিক কসাইখানার সীমানার ছোট সবুজ দরজা খুলে জানালেন, সেদিন প্রধান আধিকারিক অফিসে ছিলেন না। কী কাজ হচ্ছে জানতে চাইলে তার উত্তর, ‘আমরা শুধু আসি, কয়েক ঘণ্টা থাকি, তার পর বাড়ি চলে যাই।’ কবে আবার ব্যবসা স্বাভাবিক হবে, আদৌ হবে কি না, তারও কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।



