ব্রেক্সিটে মোহভঙ্গ, ইইউতে ফেরার পক্ষে প্রায় অর্ধেক ব্রিটিশ
- অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ইউরোপ-বার্তায় নতুন সমীকরণ
- ভোটার জরিপে আবার শীর্ষে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি

এক দশক আগে যে দরজা নিজেরাই বন্ধ করেছিল ব্রিটেন, সেই দরজার হাতলেই কি আবার হাত রাখছে দেশটি? ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বরাজনীতিতে ভূমিকম্প তুলেছিল। দশ বছর পর নতুন জনমত জরিপ বলছে, সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্রিটিশদের বড় অংশের মন বদলেছে। প্রায় অর্ধেক ভোটার এখন আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরতে চান। আর এই বদলে যাওয়া হাওয়া প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের লেবার পার্টির জন্যও নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মেসিনা গ্রুপের ১১ হাজার ৪৬১ জনকে নিয়ে করা বড় জরিপে ৪৯ শতাংশ ব্রিটিশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপক্ষে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। জরিপটি ১২ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালানো হয় এবং ২০১৬ সালের গণভোটের ফল অনুযায়ী নমুনায় ভারসাম্য রাখা হয়েছিল।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার বিভিন্ন প্রস্তাব পরীক্ষায় ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির সম্ভাব্য ভোট ৪ দশমিক ৩ থেকে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জরিপে উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ভোট আসতে পারে গ্রিন পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের দিক থেকে। তবে এটি বাস্তব নির্বাচনের ফল নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা শুনিয়ে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের ফল।
ব্রিটেনের বর্তমান সম্পর্ক রেখেও বাণিজ্য বাধা যতটা সম্ভব কমানোর পক্ষে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার। শুল্ক ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পক্ষে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ, একক বাজারে ফেরার পক্ষে ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ। মাত্র ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ ইইউ থেকে আরও দূরে সরে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
জনমতের আরেকটি ছবি আরও স্পষ্ট। ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ মনে করেন ব্রিটেনের ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, আর ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ ব্রেক্সিটকে ব্যর্থ বলে মনে করেন। সরাসরি এখনই ইইউতে ফিরতে চান ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। আরও ২২ দশমিক ৯ শতাংশ চান আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রত্যাবর্তন।
এই জরিপ প্রকাশের কয়েক দিন আগেই লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় সম্মেলনে বার্নহ্যাম বলেছিলেন, ব্রেক্সিট ব্রিটেনের “উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি” করেছে। তিনি জানিয়েছেন, নভেম্বরের যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ বৈঠকের সময় দেশের সামনে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিকল্পগুলো তুলে ধরবেন। বর্তমান অবস্থান বজায় রাখা, শুল্ক ইউনিয়ন, একক বাজার কিংবা “পুরো পথ” গিয়ে আবার ইইউ সদস্যপদ নেওয়া, সবই আলোচনায় থাকতে পারে। তবে তিনি বলেছেন, বিষয়টি এখনই নতুন গণভোটে ঝাঁপিয়ে পড়ার নয়।
শনিবার দ্য ইন্ডিপেনডেন্টে প্রকাশিত আরেক জরিপে রাজনৈতিক প্রভাবের আরও তাৎক্ষণিক ছবি পাওয়া যায়। ওপিনিয়ামের জরিপে লেবারের সমর্থন ২ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের পর দলটির সর্বোচ্চ। রিফর্ম ইউকে ২৫ শতাংশ, কনজারভেটিভ ১৭ শতাংশ, গ্রিন ১১ এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট ৯ শতাংশে রয়েছে। বার্নহ্যামের ইইউ সম্পর্কের সব বিকল্প বিবেচনার অবস্থানকে সঠিক বলেছেন ৫৪ শতাংশ, ভুল বলেছেন ২৫ শতাংশ।
তবে লেবারের ভেতরে সতর্কতাও প্রবল। ব্রেক্সিটপন্থী আসন থেকে নির্বাচিত কয়েকজন মন্ত্রী আশঙ্কা করেছেন, ইইউতে ফেরার প্রশ্ন নতুন করে তুললে পুরোনো বিভাজন জেগে উঠতে পারে এবং রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন। ফারাজ ইতিমধ্যে বার্নহ্যামের উদ্যোগকে “খুব বড় রাজনৈতিক ভুল” বলেছেন।
অন্যদিকে ইউরোপ থেকে এসেছে উষ্ণ বার্তা। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ব্রিটেন ফিরতে চাইলে সেটি দুই পক্ষের জন্যই “খুব ভালো খবর” হবে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, তাঁর দেশ ব্রিটেনকে “দুই হাত বাড়িয়ে” স্বাগত জানাবে। স্বাগত জানিয়েছে পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে জার্মানিও৷
তবু ব্রেক্সিট উল্টে যাওয়া এখনও অনেক দূরের পথ। নতুন সদস্যপদে ফিরতে হলে ব্রিটেনকে আবার আলোচনা, ইউরোপীয় নিয়ম মেনে নেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট জনসমর্থনের পরীক্ষা পার হতে হবে। কিন্তু এক দশক পর ব্রিটিশ রাজনীতিতে যে প্রশ্নটি প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেটিই এখন আবার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে: ইউরোপ ছেড়ে যাওয়া কি ছিল শেষ অধ্যায়, নাকি মাঝপথের একটি ভুল মোড়?



