খনিজের খোঁজে পানির ঝুঁকি, ইউরোপের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ

স্পেনের কাতালোনিয়ায় কয়েক মাস আগেও মানুষ পানির জন্য উদ্বিগ্ন ছিল। দীর্ঘ খরায় জলাধারগুলো প্রায় তলানিতে ঠেকেছিল। অনেক এলাকায় পানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছিল। কৃষকরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করছিলেন। আর শহরবাসী শঙ্কা করছিলেন সামনে কী অপেক্ষা করছে। ঠিক এমন সময় ইউরোপ নতুন এক দৌড়ে নেমেছে।
এটি জ্বালানি কিংবা প্রযুক্তির দৌড়। বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন বিপুল লিথিয়াম, গ্রাফাইট, কোবাল্টসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। এসব খনিজের চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন নিজস্ব ভূখণ্ডে নতুন নতুন খনি চালুর পরিকল্পনা করছে। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন—এই খনিজ কি পাওয়া যাবে পানির বিনিময়ে?
সাম্প্রতিক সময়ের এক বিশ্লেষণ বলছে, ইউরোপীয় কমিশন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের গতি বাড়াতে তাদের অন্যতম প্রধান পানি সুরক্ষা আইন সংশোধনের পরিকল্পনা করছে। লক্ষ্য একটাই—খনি প্রকল্পের অনুমোদন দ্রুত দেওয়া।
সমস্যা হলো, যেসব খনিকে ‘কৌশলগত প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে এরই মধ্যে পানির সংকট রয়েছে।
খনিশিল্পের একটি অদৃশ্য দিক আছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। একটি খনি চালু রাখতে শুধু যন্ত্রপাতি বা শ্রমিকই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ পানি। আকরিক প্রক্রিয়াজাত করা, ধুলা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা খনি থেকে পানি নিষ্কাশন—সবকিছুতেই পানির প্রয়োজন হয়।
ওয়াটারশেড ইনভেস্টিগেশন্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত তালিকাভুক্ত ৩৩টি নতুন বা সম্প্রসারিত খনির অর্ধেকেরও বেশি এমন এলাকায় রয়েছে, যেখানে গত দুই দশক ধরে পানির পরিমাণ কমছে। তথ্যগুলো এসেছে নাসার স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ থেকে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় অর্ধেক খনি এমন অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে গত তিন মাসে খরা পরিস্থিতি দেখা গেছে। এক-চতুর্থাংশ খনি আবার সরাসরি পানির সংকটপূর্ণ এলাকায়। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় স্পেন। দেশটিতে ছয়টি কৌশলগত খনি প্রকল্প অত্যন্ত পানির সংকটপূর্ণ অঞ্চলে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে পর্তুগাল ও গ্রিসেও। এই তিন দেশই ইউরোপের সবচেয়ে বেশি পানির সংকটে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
মাত্র দুই বছর আগে, ২০২২ সালে পর্তুগালের প্রায় ৯৬ শতাংশ এলাকা চরম বা গুরুতর খরার মধ্যে ছিল। আর ২০২৪ সালে কাতালোনিয়াকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ খরার কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছিল।
তাই পরিবেশবাদীরা বলেছেন, ইউরোপ এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে পানির ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এরই মধ্যে স্পেনের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ইকোলজিস্তাস এন আকসিওন’ ইউরোপীয় কমিশনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, নতুন খনিগুলো অনুমোদনের সময় পানিসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং সংরক্ষিত এলাকার ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশ্ব জুড়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা ২০১০ সালের তুলনায় তিনগুণ বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এ চাহিদা আরও দ্বিগুণের বেশি হবে। বিশেষ করে লিথিয়াম, গ্রাফাইট ও কোবাল্টের চাহিদা আগামী কয়েক দশকে কয়েকশ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ইউরোপ এখন এসব খনিজের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সেই নির্ভরতা কমাতেই ৪৭টি খনি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনর্ব্যবহার প্রকল্পকে ‘কৌশলগত প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে ৩৩টিই খনি প্রকল্প।
তবে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ওয়াটার ফ্রেমওয়ার্ক ডিরেকটিভ’ বা ডব্লিউএফডি। নদী, জলাভূমি এবং ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষার জন্য ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর একটি এটি। এখন সেই আইনই পরিবর্তনের কথা ভাবছে ব্রাসেলস।
খনিশিল্পের সংগঠন ইউরোমাইনস বলছে, বিদ্যমান নিয়মকানুন অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব সৃষ্টি করে। তাদের মতে, পরিবেশ সুরক্ষা বজায় রেখেই অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা সম্ভব।
কিন্তু সমালোচকরা আশ্বস্ত নন। ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্টাল ব্যুরোর পানিনীতি ব্যবস্থাপক সারা জোহানসনের মতে, বর্তমান আইন খনিশিল্পের জন্য বড় কোনো বাধা—এমন প্রমাণ এখনো কেউ দেখাতে পারেনি।
আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথের পরিচালক অধ্যাপক কাভেহ মাদানি। তার মতে, পানির সংকটপূর্ণ এলাকায় পরিবেশগত সুরক্ষা দুর্বল করে খনি অনুমোদন দেওয়া অনেকটা ‘রাশিয়ান রুলেট’ খেলার মতো।
আজ এটি অর্থনৈতিক সুযোগ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি বড় দুর্ঘটনা কিংবা একটি দূষণকাণ্ড বহু বছরের জন্য নদী, জলাধার, কৃষি এবং মানুষের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অবশ্য খনি কোম্পানিগুলো এসব আশঙ্কা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তি, পানি পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তবু প্রশ্নটি থেকেই যায়। সবুজ জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে ইউরোপ কি তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ পানিকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে? নাকি প্রযুক্তি ও পরিবেশের মধ্যে এমন একটি ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যেখানে খনিজও মিলবে, পানিও রক্ষা পাবে? উত্তরটি হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।








