বাজেটের আগে ব্রিটেনের আকাশে কালো মেঘ, ঋণের চাপে টলছে অর্থনীতি
- বন্ড বাজারের ধাক্কায় বিপাকে বার্নহ্যাম সরকার, বিলিয়ন পাউন্ডের হিসাব মেলাতে হিমশিম
- সরকারি ঋণের খরচ প্রায় ৩০ বছরের সর্বোচ্চ স্তরে
- কর বাড়ানো নাকি খরচ কমানো–কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ডাউনিং স্ট্রিট

ব্রিটিশ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে গিল্টস (সরকারি বন্ড) বাজার থেকে।
বাজেটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই কঠিন হয়ে উঠছে ব্রিটেনের অর্থনীতির হিসাব। একদিকে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে সরকারি ঋণের বাড়তে থাকা বোঝা–দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকার। এবার সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারের অস্থিরতা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজেট ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ আগে ব্রিটেন বর্তমানে “অস্বস্তিকর আর্থিক অবস্থানে” রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সরকারি ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অর্থমন্ত্রী জন হিলির সামনে তৈরি হয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্রিটিশ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে গিল্টস (সরকারি বন্ড) বাজার থেকে। ১০ বছরের সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে প্রায় ৫.২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, আর ৩০ বছরের বন্ডের হার উঠেছে প্রায় ৫.৮৭ শতাংশে। এর অর্থ, সরকার নতুন ঋণ নিলে আগের তুলনায় অনেক বেশি সুদ গুনতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু সরকারের হিসাবেই প্রভাব ফেলবে না, সাধারণ মানুষের জীবনেও তার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ সরকারি ঋণের খরচ বাড়লে তা শেষ পর্যন্ত কর, সরকারি পরিষেবা এবং সুদের হারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বাড়তে পারে ঋণ নেওয়ার খরচ, যার প্রভাব পড়তে পারে বাড়ির ঋণ বা মর্টগেজের ক্ষেত্রেও।
এই পরিস্থিতির মধ্যে আগামী ২৮ অক্টোবর প্রথম বাজেট পেশ করতে চলেছেন অর্থমন্ত্রী জন হিলি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বাজারের আস্থা ধরে রাখতে তাঁকে হয় কর বৃদ্ধি, নয়তো সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্ড বাজারের সাম্প্রতিক ধাক্কার পর হিলির সামনে এখন “বিলিয়ন পাউন্ডের হিসাব” মেলানোর চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা চাইছেন, সরকার যেন নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে এবং আর্থিক শৃঙ্খলার বার্তা দেয়।
বিশ্ব বাজারের অস্থিরতাও ব্রিটেনের সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় সরকারি বন্ডের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে শুধু ব্রিটেন নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঋণ বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
তবে বার্নহ্যাম সরকার জানিয়েছে, তারা আর্থিক দায়িত্বশীলতার পথেই থাকবে। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবায় পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু বাজারের চাপের মধ্যে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করাই এখন বড় পরীক্ষা।
বিরোধীরা অবশ্য সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, বড় ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখন বার্নহ্যাম সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের সমর্থকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য কিছু বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং তা থেকেই ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি হবে।
ব্রিটেনের সামনে এখন শুধু একটি বাজেট নয়, বরং আস্থার পরীক্ষা। কারণ বন্ড বাজারের বার্তা স্পষ্ট, সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন নজরে রাখছে বিনিয়োগকারীরা। আগামী ২৮ অক্টোবরের বাজেট তাই শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বার্নহ্যাম সরকারের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতারও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে চলেছে।





