দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘ভেটো’ আর মানছে না যুক্তরাষ্ট্র?

হাওয়াইয়ের হনোলুলুতে নিমিটজ-ম্যাকআর্থার প্যাসিফিক কমান্ড সেন্টার—ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নীরবে একটি পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ভারত ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো বলছে, ওয়াশিংটন এখন আর শুধু নয়াদিল্লিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশল সাজাচ্ছে না।
এর একটি প্রতীকী উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম আবার ‘প্যাসিফিক কমান্ড’ করা। ২০১৮ সালে ‘ইন্দো’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বকে সামনে রেখে। এখন সেই নাম পরিবর্তন অনেকের কাছেই নতুন কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি শুধু নামের পরিবর্তন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বদলেরও ইঙ্গিত। ভারতের সংসদ সদস্য শশী থারুরও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, এতে কোয়াড জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।
বছরের পর বছর দক্ষিণ এশিয়াকে দেখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেকটাই ভারতকেন্দ্রিক। পাকিস্তানকে দেখা হতো নিরাপত্তা ইস্যুর দৃষ্টিতে। বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ হিসেবে। নেপালকে ভাবা হতো ভারতের প্রভাববলয়ের একটি দেশ। ছোট দেশগুলোর নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থানকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো না।
কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক জোরদার করছে। এসব দেশকে আর ভারতের নীতির সম্প্রসারণ হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব স্বার্থ ও সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট। দীর্ঘদিন সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সম্পর্ক এখন খনিজসম্পদ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়েও বিস্তৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সমীকরণ গড়ে তুলতে চাইছে।
বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান, বিশাল উৎপাদন খাত এবং আঞ্চলিক সংযোগের কারণে ঢাকা এখন ওয়াশিংটনের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা ও প্রযুক্তি অংশীদারত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশ একই সময়ে চীন ও ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
নেপালের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কাঠমান্ডুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদা ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই পরিবর্তনের আরেকটি কারণ অর্থনীতি। ভারত এখন শুধু কৌশলগত অংশীদার নয়, ভবিষ্যতের একটি বড় অর্থনৈতিক প্রতিযোগী হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্রের নজরে এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, ইলেকট্রনিকস ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে ভারতের অগ্রগতি ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
চীনের উত্থান থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত আর কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে চায় না। বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে। বরং সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে। ভারত এখনো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লিকে আর একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
ফলে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের মতো দেশগুলোও এখন নিজেদের স্বার্থে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতকেও আঞ্চলিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে নতুন করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেখাতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ভারত এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই অঞ্চলে ভারতের অনানুষ্ঠানিক ‘ভেটো’ বা একচ্ছত্র প্রভাবের ধারণা আগের মতো আর কার্যকর থাকছে না, এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।




