বিলুপ্তির পথে সুমাত্রান বাঘ, এলো চার নতুন প্রাণ

সংগৃহীত ছবি
নিঃশব্দ এক গুহার ভেতরে গোল হয়ে শুয়ে আছে চারটি ছোট্ট ডোরাকাটা শরীর। কেউ মায়ের গা ঘেঁষে ঘুমাচ্ছে, কেউ আবার কৌতূহলী চোখে চারপাশ দেখার চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝেই তাদের মধ্যে একটি হালকা স্বরে ডাকছে, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে, মা খুব দূরে চলে যায়নি তো!
ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবারির কাছেহাওলেটস ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল পার্কের সেই ছোট্ট নিরিবিলি জায়গাটিতে এখন তাই অন্যরকম এক আনন্দের আবহ। কারণ, সেখানে জন্ম নিয়েছে চারটি সুমাত্রান বাঘশাবক—এমন এক প্রজাতির নতুন সদস্য, যাদের পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার ভয় দিন দিন আরও বাড়ছে।
গত ৯ এপ্রিল জন্ম নেওয়া এই চারটি শাবক শুধু একটি চিড়িয়াখানার নতুন অতিথি নয়, বরং পুরো পৃথিবীর জন্যই এক টুকরো স্বস্তির খবর। কারণ বন্য পরিবেশে এখন ৪০০টিরও কম সুমাত্রান বাঘ টিকে আছে। প্রতিদিন বন কমছে, বাড়ছে চোরাশিকার, সংকুচিত হচ্ছে তাদের বেঁচে থাকার জায়গা। সেই পৃথিবীতেই চারটি নতুন প্রাণ যেন বলছে— ‘আমরা এখনো আছি।’
শাবকগুলোর মা টিপাহ। বয়স ছয় বছরের কাছাকাছি। পার্কের কর্মীরা তাকে চেনে দুষ্টু, স্বাধীনচেতা আর কৌতূহলী স্বভাবের বাঘ হিসেবে। কিন্তু মা হওয়ার পর যেন বদলে গেছে সে। এখন দিনের বেশিরভাগ সময় সন্তানদের ঘিরেই কাটছে তার।
কর্মীরা বলছেন, টিপাহ খুব যত্ন নিয়ে শাবকদের বড় করছে। কাউকে খুব কাছে ঘেঁষতে দেয় না, আবার দূর থেকেও সবসময় নজর রাখে। মাঝে মাঝে সে একটু দূরে গেলেই একটি শাবক জোরে ডাকতে শুরু করে। তখন টিপাহ দ্রুত ফিরে আসে সন্তানদের কাছে।
চারটি শাবকের মধ্যে একটি আবার অন্যদের তুলনায় একটু বড়। হাঁটাচলাতেও বেশ সাহসী। যদিও এখনো তাদের লিঙ্গ নিশ্চিত করা হয়নি, তবু পার্কের কর্মীরা ইতোমধ্যেই তাদের আলাদা আলাদা স্বভাব চিনতে শুরু করেছেন।
শাবকগুলোর বাবা নাকাল। ২০২৫ সালে তাকে এই পার্কে আনা হয়। এখন অবশ্য সন্তানদের জন্মের পর আলাদা রাখা হয়েছে তাকে। কর্মীদের ভাষ্য, নাকাল যেন টিপাহকে কিছুটা ‘মিস’ করছে। বিশ্বজুড়ে সুমাত্রান বাঘকে এখন ‘মহাবিপন্ন’ প্রাণী হিসেবে ধরা হয়। এরা মূলত ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের গভীর জঙ্গলে বাস করে। অন্য বাঘদের তুলনায় আকারে ছোট হলেও এদের চলাফেরা দ্রুত, শরীরের ডোরাও তুলনামূলক গাঢ়।
কিন্তু মানুষের দখলে বন কমে যাওয়ায় তাদের জীবনও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অনেক বাঘ শিকারিদের হাতে মারা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ খাবারের অভাবে মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে সংঘাতও বাড়ছে।
প্রাণী সংরক্ষণবিদরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে বন্দি পরিবেশে নতুন শাবকের জন্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু সংখ্যা বাড়ানো নয়, ভবিষ্যতে পুরো প্রজাতিটিকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের অংশ। পার্কের এক কর্মী বলছিলেন, ‘এই চারটি শাবককে যখন একসঙ্গে ঘুমাতে দেখি, তখন মনে হয় পৃথিবী এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।’
সত্যিই, এই চারটি ছোট্ট প্রাণ হয়তো এখনো জানে না পৃথিবী তাদের কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তারা জানে না, তাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো একটি প্রজাতির ভবিষ্যৎ। তবু তারা বড় হবে। হাঁটতে শিখবে। গর্জন করতে শিখবে। আর হয়তো একদিন এই পৃথিবীকে মনে করিয়ে দেবে—প্রকৃতি এখনো হেরে যায়নি।






