মহানগরের ছায়ায় হংকংয়ে কফির স্বপ্ন

হংকংয়ের লানতাউ দ্বীপে অবস্থিত এলসিসি রোস্টারিতে রিঙ্গো লাম। ছবি: সিএনএন
হংকংয়ের ব্যস্ত নগরজীবনের পাশেই অবস্থিত লানতাউ দ্বীপ। ভিন্ন এক স্বপ্ন জন্ম নিচ্ছে এই দ্বীপে। কিছু কফিপ্রেমী উদ্যোগে এখানে হচ্ছে কফি চাষ ও প্রক্রিয়াজাত। ছোট্ট এই প্রচেষ্টা এখন কৌতূহল জাগাচ্ছে কফিপ্রেমীদের মধ্যে। আর আশা দেখাচ্ছে মহানগরের ছায়াতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে কফির সুবাস।
লানতাউ দ্বীপের এলসিসি রোস্টারির চিলেকোঠার একটি কফি রোস্টার মেশিন। মেশিনটি ধীরে চলা ট্রেনের মতো গুনগুন শব্দ তুলে প্রস্তুত করছে সদ্য ভাজা কফি বিন। এই কারুশিল্পভিত্তিক কফি বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক রিঙ্গো লাম। তিনি গর্বের সঙ্গে দেখান তার সংগ্রহ।
ইথিওপিয়া লেখা একটি জারে রয়েছে জুঁই ফুল, ট্রপিক্যাল ফল ও আনারসের স্বাদের আভাস। আরেকটি কলম্বিয়া বিনে পাওয়া যায় মাখন, ক্যারামেল ও ডার্ক চকোলেটের ঘ্রাণ।
তবে সবচেয়ে আলাদা একটি জার। তাতে লেখা, লানতাউ বিন।
এই জারেই লুকিয়ে আছে লাম ও তার সহকর্মী কফিপ্রেমীদের সাহসী স্বপ্ন। তারা প্রমাণ করতে চাইছেন, ব্যস্ত মহানগরের পাশেও কফি চাষ সম্ভব।
৫৫ বছর বয়সী সাবেক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা লাম কয়েক বছর ধরে কাজ করছেন লানতাউ দ্বীপের কৃষকদের সঙ্গে। সবুজ পাহাড় ও শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত এই দ্বীপটি হংকং শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের ফেরি যাত্রার দূরত্বে। তাদের লক্ষ্য, হংকংয়ের নিজস্ব কফি উৎপাদন।
এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দেশ ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া বহুদিন ধরেই বিশ্বের সেরা কফির জন্য পরিচিত। কারণ, সেখানে রয়েছে উপযোগী উষ্ণ আবহাওয়া। কিন্তু পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে জাপান ও চীনের মতো দেশে তীব্র শীত বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কফি চাষের। যদিও চীনের ইউনান অঞ্চল বা তাইওয়ানের আলিশান পর্বতমালার মতো কিছু উচ্চভূমিতে চাষ হয় উন্নতমানের অ্যারাবিকা কফি।
৭৫ লাখ মানুষের নগরী হংকংয়ে রয়েছে ৭০০টির বেশি ক্যাফে। তবে কখনোই কফি উৎপাদনের উপযুক্ত স্থান হিসেবে ভাবা হয়নি এই নগরীকে। চায়ের প্রতি সাংস্কৃতিক ঝোঁক এবং আকাশছোঁয়া জমির দাম অধিকাংশ খাদ্যপণ্য আমদানিনির্ভর করে তুলেছে শহরটিকে। ফলে স্থানীয়ভাবে কফি উৎপাদনের ধারণা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
সিএনএনকে লাম বলেছেন, ‘মানুষ সাধারণত কফির কথা ভাবলে ইথিওপিয়া বা কলম্বিয়ার মতো দেশের কথা ভাবে। এগুলো বেশিরভাগ মানুষের ভ্রমণের তালিকায়ও থাকে না।’
তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু যখন কেউ শুনছে, তাদের আশপাশেই কফি চাষ হচ্ছে। তখন তারা জিজ্ঞেস করছে, হংকংয়ে সত্যিই কফি জন্মায়?’ উত্তর হলো, হ্যাঁ।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত কফি খামার প্রকল্পের প্রশিক্ষক কেটি চিক বলেছেন, ‘কফি গাছের জন্য শুধু পাহাড়ি অঞ্চলই দরকার হয় না। মূল বিষয় হলো অঞ্চলটি তথাকথিত কফি বেল্টের মধ্যে আছে কি না। বিষুবরেখার উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ২৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলের মধ্যেই পড়ে হংকং। এটি বিষুবরেখা থেকে ২২ ডিগ্রি উত্তরে অবস্থিত।’
চিক বলেছেন, ভৌগোলিকভাবে হংকং কফি চাষের জন্য উপযোগী। শুধু উচ্চতার আছে কিছু সীমাবদ্ধতা।
বিশ্বের জনপ্রিয় কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর অধিকাংশই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার মিটারের বেশি উঁচুতে। কিন্তু হংকংয়ের সর্বোচ্চ চূড়াও তার নিচে। আর এখানকার খামারগুলো বেশ নিচু এলাকায় অবস্থিত।
তার ভাষায়, ‘পাহাড়ি এলাকায় দিনের তাপমাত্রা ওঠানামা বেশি হয়। যা কফি বিনে জৈব রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়ে স্বাদকে আরও জটিল ও সমৃদ্ধ করে তোলে। তবে এটিই একমাত্র শর্ত নয়।’
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কেন্দ্রটি বর্তমানে পরিচালনা করছে শহরের সবচেয়ে বড় কফি খামার। সেখানে ৮০০টি কফি গাছ রয়েছে। যেগুলো থেকে বছরে প্রায় ৫০ কেজি কফি বিন পাওয়া যায়। শুরুতে এটি ছিল একটি পুরোনো গ্রাম পুনরুজ্জীবনের প্রকল্প। কিন্তু এখন তারা কফি বিক্রি করছে স্থানীয় বাজারেও।
লামের এই যাত্রা শুরু হয় ছয় বছর আগে পানামা সফরে গিয়ে। সেখানে কফি শিল্প সম্পর্কে জানার সময় তিনি উপহার হিসেবে ১০০টি কফি বীজ পান।
তিনি বলেছেন, ১০০টি বীজের মধ্যে অঙ্কুর বের হয়েছিল প্রায় ৮০টির মতো।
এরপর লানতাউ দ্বীপের পরিচিত কৃষকদের ফোন করে চারাগাছ নেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। শুরুতে পাঁচজন রাজি হন। পরে যোগ দেন আরও অনেকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে চারাগুলো টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হন তারা।
বর্তমানে ২৫ জন কৃষক লানতাউ দ্বীপে পরিচর্যা করছেন প্রায় ৪০০টি কফি গাছের। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ফসল পেয়েছেন তারা। প্রায় ১০ কেজি কফি চেরি, যা ২০২৩ সালের প্রথম ফলনের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।
এখন প্রতিবছর একত্রিত হয়ে উৎপাদন পদ্ধতি উন্নয়নের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন স্থানীয় কফি চাষিরা।
তবে এই কৃষকদের লক্ষ্য বৈশ্বিক কফি বাজারে আধিপত্য বিস্তার নয়। লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো বড় উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও নয়। উৎপাদন ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় কেবল কফি বিক্রি করে লাভজনক ব্যবসা গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।
তাদের ১০ কেজি কফি উৎপাদনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে খুবই সামান্য। যেখানে ব্রাজিল, বিশ্বের বৃহত্তম কফি উৎপাদক দেশ। গত বছর ৬ কোটি ৩০ লাখ ব্যাগ কফি উৎপাদন করেছে। প্রতিটি ব্যাগের ওজন ৬০ কেজি।
তাহলে স্বাদ কেমন?
সিএনএনের পরীক্ষায় মনে হয়েছে হংকংয়ে উৎপাদিত দুটি কফিকে মসৃণ ও সহজপাচ্য। তবে শহরের বিশেষায়িত ক্যাফেগুলোর জটিল ও সমৃদ্ধ স্বাদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে।
এই সীমাবদ্ধতাই নতুন উদ্ভাবনে উৎসাহ দিচ্ছে স্থানীয় কফি উদ্যোক্তাদের। বিভিন্ন ধোয়া ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি পরীক্ষা করছেন তারা। কর্মশালা আয়োজন করছেন এবং স্থানীয় কফি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় কফির প্রচারে কাজ করছেন সিড টু কাপ নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মাইক সিমও। ফানলিং এলাকায় একটি খামার ভাড়া নিয়ে কফি চাষের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করছেন তিনি।
গত বছর এক বারিস্তার সঙ্গে অংশীদার হয়ে কফি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। সেখানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কফির সঙ্গে মেশানো হয়েছিল কলম্বিয়ান জাতের কফি।
জিততে না পারলেও এটিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সিম। তিনি বলেছেন, ‘আমরা মানুষকে দেখাতে পেরেছি যে হংকংয়েও এখন খামার আছে। যারা বারিস্তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কাজ করছে।’
এ বছর শুধু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কফি দিয়েই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তারা।
লামের সঙ্গে কাজ করা কৃষকদের একজন চান ফাং-মিং। সমাজকর্মীর চাকরি ছেড়ে কয়েক বছর আগে পারিবারিক খামারের দায়িত্ব নেন তিনি।
উদ্যানচর্চাভিত্তিক থেরাপিতে বিশেষজ্ঞ এই নারী মনে করেন, তরুণদের কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে কফি।
তিনি বলেছেন, এটা মানুষকে চাষাবাদের জগতে নিয়ে আসার একটি মাধ্যম।
লাম তার রোস্টারির পাশাপাশি একটি কর্মশালাও চালান। যেখানে অংশগ্রহণকারীরা নিজের হাতে কফি চেরি সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করতে শেখেন। তার মতে, ‘এতে মানুষ বুঝতে পারে দূরদেশের কৃষকেরা প্রতিদিন কত কঠোর পরিশ্রম করে বিশ্বকে কফি সরবরাহ করছেন।’
তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে এসব কৃষক আরও ভালো পারিশ্রমিক ও স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। যেমন একটি ওয়াইনের সঙ্গে তার উৎপাদনস্থলের পরিচয় জড়িয়ে থাকে।
লাম জানান, প্রতি কেজি কফি বিন থেকে প্রায় ৪৪ কাপ কফি তৈরি হয়। অথচ কৃষকেরা পান মাত্র ২ থেকে ৩ ডলার।
তিনি বলেছেন, হংকংয়ের মতো বড় শহরের মানুষ সাধারণত এসব বাস্তবতা জানে না।
তার মতে, হংকংয়ে বড় পরিসরে কফি চাষ সম্ভব না হলেও, এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষ কফির উৎসের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পারবে।
আর কর্মশালার পর অংশগ্রহণকারীদের আচরণেও পরিবর্তন দেখেছেন তিনি।
সাধারণত তারা পুরো কাপটাই শেষ করেন, বলেছেন লাম। এরপর হয়তো কফির জন্য একটু বেশি দাম দিতেও আগ্রহী হয় তারা।













