চীনের বিখ্যাত সবুজ চায়ের গল্প
- এক কেজি চায়ের দাম পড়ে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১ লাখ টাকা

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হ্যাংজুর কাছাকাছি পাহাড়গুলোতে লংজিং চা সংগ্রহ করা হয়ে আসছে।
চিনের হ্যাংজু শহরের পাহাড়ি ঢালে গে শিয়াওপেং নামের এক কৃষক তাকিয়ে আছেন চা পাতার দিকে। তিনি নিজের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় কচি চা পাতাগুলো সংগ্রহ করছেন ঝুড়িতে। পান্নার মতো সবুজ আর মসৃণ এই পাতাগুলোই হলো চিনের বিখ্যাত ‘লংজিং’ চা, যা সারা বিশ্বের চা প্রেমীদের কাছে এক আরাধ্য বস্তু।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লংজিং চা মানুষের কাছে এক আভিজাত্যের প্রতীক। আঠারো শতকে চিনের সম্রাট চিয়ানলং এই চায়ের স্বাদ পেয়ে এতটাই পাগল হয়েছিলেন যে, আঠারোটি চা গাছকে তিনি রাজকীয় মর্যাদা দিয়েছিলেন। তখন থেকেই এই চা শুধু রাজদরবারের জন্য বরাদ্দ থাকতো।
লংজিং চায়ের আসল স্বাদ পেতে বর্তমানে মানুষের ঢল নামছে হ্যাংজুর চা গ্রামগুলোতে। বাজারে নকল চায়ের ভিড় বাড়ায় মানুষ এখন সরাসরি উৎস থেকে চা কেনাকেই নিরাপদ মনে করছে। কারণ, আধুনিক মেশিনের যুগেও আসল লংজিং চা এখনো তৈরি হয় কারিগরের হাতের জাদুতে।
চতুর্থ প্রজন্মের চা চাষি শিয়াওপেং মনে করেন, এই চায়ের সবকিছুই নির্ভর করে সঠিক সময়ের ওপর। বসন্তের শুরুতেই অর্থাৎ মার্চের মাঝামাঝি সময়ে যে কুঁড়িগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোর কদর সবচেয়ে বেশি। এই সময়ে চায়ের গন্ধে থাকে হালকা বাদামের সুবাস আর মুখে দিলে পাওয়া যায় এক স্বর্গীয় অনুভূতি।
চায়ের এই বিশেষ গ্রেড বা ‘মিং কিয়ান’ স্তরের দাম শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠবে! মাত্র আধা কেজি এই প্রিমিয়াম চায়ের দাম এখন ৩০,০০০ ইউয়ান (প্রায় ৪,৪০০ ডলার)। আগেকার দিনে মানুষ এত দাম কল্পনাও করতে পারতো না, কিন্তু এখন চাহিদা বাড়ায় দাম চলে গেছে আকাশছোঁয়ায়।
শহর ফেরত মানুষগুলো এখন আবার ভিড় করছেন নিজেদের আদি ভিটায়। এই বিশেষ চা চাষের জন্য আবহাওয়া হতে হয় একদম মাপা, যেমন হালকা রোদ আর সাথে একটু কুয়াশা ভেজা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন সঠিক সময়ে এই চা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
চা পাতা তোলার পর কারিগররা শুরু করেন সেঁকার এক অদ্ভুত পরিশ্রমের কাজ। প্রায় ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার জ্বলন্ত কড়াইয়ে শিয়াওপেং-এর বাবা গে ঝেংহুয়া খালি হাতে নাড়াচাড়া করেন কচি চা পাতাগুলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভয়ংকর গরমেও তিনি কোনো গ্লাভস ব্যবহার করেন না।
ঝেংহুয়া বিশ্বাস করেন, হাতের ছোঁয়া ছাড়া চায়ের আসল রূপ ফুটে ওঠা অসম্ভব। গ্লাভস না পরার কারণ হিসেবে তিনি জানান, হাতের তালু দিয়ে তাকে অনুভব করতে হয় কড়াইয়ের তাপ আর পাতার আর্দ্রতা। তার মতে, মেশিন তো মৃত বস্তু, কিন্তু মানুষের হাত হলো জীবন্ত যা চায়ের সুবাসকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
বর্তমানে জালিয়াতি রুখতে চিন সরকার এক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। নির্দিষ্ট ১৬৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকার বাইরের কোনো চা-কে এখন আর ওয়েস্ট লেক লংজিং নামে বিক্রি করা যায় না। আসল চায়ের প্যাকেটে এখন কিউআর কোড দেওয়া থাকে, যা স্ক্যান করলেই বোঝা যায় এটা কোন খামারের চা।
লংজিং চায়ের প্রতি এই ভালোবাসা আসলে চিনের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক দারুণ ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এখন বিদেশি কফি ছেড়ে নিজেদের ঐতিহ্যের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। চায়ের প্রশিক্ষক চেন ইফাং এই চায়ের স্বাদকে তুলনা করেন বসন্তের কচি মটর শুঁটির ফুলের সাথে।
তিনি মনে করেন, এই চা পান করার জন্য একটু ধৈর্যের প্রয়োজন। কফি বা কড়া লিকারের চায়ের মতো এটি শুরুতেই আপনাকে ধাক্কা দেবে না, বরং ধীরে ধীরে তার আসল চরিত্র আপনার সামনে মেলে ধরবে। এটি কেবল একটি পানীয় নয়, বরং এক প্রশান্তির নাম।
চাষি ঝেংহুয়া এক সময় ভয় পেতেন যে, তার সাথে সাথেই হয়তো এই শিল্প হারিয়ে যাবে। কিন্তু আনন্দের বিষয় হলো, শিক্ষিত তরুণরা এখন শহর ছেড়ে আবার খামারে ফিরে আসছে। কারণ, এই চা চাষ এখন শুধু ব্যবসাই নয়, বরং এটি তাদের নাড়ির টান এবং জন্মভূমির আসল সুবাস।
আপনি কি কখনো এমন এক কাপ চা খাওয়ার কথা ভেবেছেন যার জন্য গুনতে হবে লাখ টাকা? অথবা স্রেফ এক কাপ চায়ের প্রশান্তির জন্য কি হারিয়ে যেতে চান চিনের সেই কুয়াশাঘেরা পাহাড়ে?
একটু সময় নিয়ে ভাবুন, এই আভিজাত্যই হয়তো দুনিয়ার সেরা স্বাদ!
সূত্র: বিবিসি








