বৈদ্যুতিক গাড়ির পর রোবোট্যাক্সিতেও কি বিশ্বজয় করবে চীন?

চীনের বিভিন্ন শহরে রোবোট্যাক্সির পরীক্ষামূলক সেবা চালাচ্ছে দেশটির বিভিন্ন কোম্পানি। ছবি: বিবিসি
বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) পর এবার রোবোট্যাক্সিতে নজর চীনের। বেইজিংয়ের সড়কে এখন নিয়মিত যাত্রী বহন করছে চালকহীন ট্যাক্সি।
ইভির মতো এই প্রযুক্তিতেও বিশ্ববাজারে আধিপত্য গড়তে চায় চীন। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে নিরাপত্তা, জনআস্থা ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক বাধাও।
বেইজিংয়ের ইঝুয়াং শহরে এখন চালকবিহীন যানবাহন নিত্যদিনের দৃশ্য। সাধারণ গাড়ির পাশাপাশি সড়কে চলাচল করছে রোবোট্যাক্সি। আবার নির্ধারিত সংগ্রহকেন্দ্রে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ডেলিভারি ভ্যান।
ইঝুয়াং শহর বর্তমানে চীনে স্বচালিত যানবাহন প্রযুক্তি পরীক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। এখানে বাইডু, উইরাইড ও পনি.এআই নির্ধারিত এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করছে রোবোট্যাক্সি।
শুধু একটি অ্যাপে যাত্রা বুক করলেই ব্যবহার করা যায় রোবোট্যাক্সি। বুক করার কয়েক মিনিটের মধ্যে চালকবিহীন গাড়ি এসে তুলে নেয় যাত্রীকে। টাচস্ক্রিনে গন্তব্য নিশ্চিত করার পর গাড়িটি তাল মিলিয়ে চলতে থাকে বেইজিংয়ের ব্যস্ত সড়কের বাস, সাইকেল, মোটরসাইকেল, পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে।
প্রযুক্তিটি এখনও উন্নয়নের পর্যায়ে। তবে এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইভির বাজারে যেমন চীন বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছে, তেমনি রোবোট্যাক্সির ক্ষেত্রেও কি বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে তারা?
চীনের স্বচালিত যানবাহন শিল্পের বড় শক্তি হলো তাদের শক্তিশালী ইভি শিল্পভিত্তি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার গড়ে তোলার ফলে তৈরি হয়েছে এই শিল্প অবকাঠামো। এখন সেটিই স্বচালিত প্রযুক্তির বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
টেসলা যেখানে অধিকাংশ প্রযুক্তি নিজস্বভাবে তৈরি করে, সেখানে চীনের মডেলটি ভিন্ন। বিওয়াইডি, চেরি, জিলি ও এসএআইসির মতো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গাড়ি তৈরি করছে তারা। আর বিশেষায়িত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো উন্নয়ন করছে সফটওয়্যার।
স্বচালিত গাড়িতে ব্যবহৃত ব্যাটারি, সেন্সর, চিপ ও অনবোর্ড কম্পিউটারের বড় অংশই বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো। ফলে বিদ্যমান সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে এবং দ্রুত সম্ভব হচ্ছে প্রযুক্তি উন্নয়ন।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি গবেষক কাইল চ্যানের ভাষ্য, ‘চীনের ইভি শিল্পে যে গতিতে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির অভিযোজন হচ্ছে, তার তুলনা বিশ্বে খুব কমই রয়েছে।’
তার মতে, ইভি শিল্পের সক্ষমতা এখন ব্যাটারি, মোটর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য প্রযুক্তিখাতেও।
এ খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সরকারি নীতিও। চীনের বিভিন্ন শহরে পরীক্ষামূলকভাবে জনসাধারণের সড়কে অনুমতি দেওয়া হয়েছে স্বচালিত যানবাহন চলাচলের।
একই সঙ্গে চীনের ব্যস্ত ও জটিল সড়ক পরিবেশও প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়ক। একটি যাত্রাপথেই মোকাবিলা করতে হয় স্বচালিত গাড়িকে বাস, মোটরসাইকেল, সাইকেল, পথচারী ও অনিশ্চিত যানজট। এসব বাস্তব পরিস্থিতি থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ তথ্য আরও দক্ষ করে তুলছে সফটওয়্যারকে।
উইরাইডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মেভ ঝ্যাং বলেছেন, ‘চীনের সড়ক পরিবেশ অত্যন্ত জটিল। ফলে এখানকার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তির উন্নয়নে। তবে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরম, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারী বৃষ্টি কিংবা সুইজারল্যান্ডের তীব্র শীত স্বচালিত প্রযুক্তির জন্য তৈরি করতে পারে নতুন চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ব্যাটারির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, আর বৃষ্টি, তুষার ও কুয়াশা ক্যামেরাসহ প্রভাব ফেলে সেন্সরের কার্যক্ষমতায়।’
রোবোট্যাক্সির পাশাপাশি স্বচালিত বাস, যাত্রীবাহী গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহনেও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে চীন। কিউক্রাফট এরইমধ্যে ২০টির বেশি চীনা শহরে পরিচালনা করছে স্বচালিত বাস। এটি সম্প্রসারণ করছে আন্তর্জাতিক বাজারেও।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেমস ইউ বলেছেন, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে স্বচালিত প্রযুক্তি।
বর্তমানে বাণিজ্যিক রোবোট্যাক্সি সেবায় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালফাবেটের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওয়েমো শীর্ষ। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শহরে পরিচালনা করছে চালকবিহীন ট্যাক্সি। অন্যদিকে টেসলা ও অ্যামাজনের মালিকানাধীন জুক্স এগোচ্ছে ধীরে। ২০১৮ সালের একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর নিজস্ব স্বচালিত গাড়ি প্রকল্প বন্ধ করে দেয় উবার।
তবে এখন উবার ও লিফট অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে চীনের স্বচালিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে। এতে তারা নিজস্ব অ্যাপ তৈরি না করেই সুযোগ পাচ্ছে লাখো গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর।
সিনো অটো ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা তু লে বলেছেন, ‘ওয়েমো ও চীনের বিভিন্ন রোবোট্যাক্সি ব্যবহার করে তার অভিজ্ঞতায় ওয়েমোর সেবার মান এখনও এগিয়ে রয়েছে।’
তার মতে, ক্যালিফোর্নিয়ায় এখন অনেকের কাছে নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠেছে ওয়েমো।
তবে উদ্বেগ এখনও রয়ে গেছে নিরাপত্তা নিয়ে। চলতি বছরের শুরুতে বাইডুর অ্যাপোলো গো সেবায় সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে উহানে একসঙ্গে অচল হয়ে পড়ে প্রায় ১০০টি রোবোট্যাক্সি।
কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেন, গাড়ির দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যাওয়ায় বের হতে পারেননি তারা। পরে কয়েক সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখা হয় সেবা। যদিও বাইডু জানিয়েছে, চলতি বছর যুক্তরাজ্যে সেবা চালুর পরিকল্পনা বহাল রয়েছে এখনও।
এর আগে ২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি দুর্ঘটনার পর জেনারেল মোটরসের স্বচালিত প্রতিষ্ঠান ক্রুজের কার্যক্রমও বড় ধাক্কা খায়। দুর্ঘটনায় অন্য একটি গাড়ির ধাক্কায় আহত এক পথচারীকে তাদের রোবোট্যাক্সি কয়েক মিটার টেনে নিয়ে যায়। পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন স্থগিত করে এবং জিএম ব্যক্তিগত গাড়ির স্বচালিত প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির তুলনায় রোবোট্যাক্সিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। কারণ এতে জটিল নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, উচ্চমানের মানচিত্র, স্থানীয় পরিচালনা ব্যবস্থা, জনআস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিরাপত্তা ইস্যু।
এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ অবস্থান, মানচিত্র ও ক্যামেরাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করে রোবোট্যাক্সি। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে, যা এ প্রযুক্তির বিস্তারে বাধা হতে পারে অনেক দেশে।
তবে উইরাইডের দাবি, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সরকার স্বচালিত প্রযুক্তির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নে এগিয়ে আসছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যানের মতে, রোবোট্যাক্সি কেবল নতুন ধরনের পরিবহন নয়, বরং এটি চীনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ।
তার ভাষ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর, ডিজিটালভাবে সংযুক্ত এবং ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটর প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতেই এগিয়ে যাচ্ছে চীন।
সূত্র: বিবিসি






