ট্রাম্পকে এত উষ্ণ অভ্যর্থনা কেবল চীনের কূটনৈতিক সৌজন্যতা?

ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর করে ফিরেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্পের এবারের সফরটি ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রম। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দেওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা দেখে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। লম্বা সময় ধরে ভূ-রাজনৈতিকভাবে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করা দুই দেশের প্রেসিডেন্টের এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ সত্যিই বিরল।
তবে ট্রাম্পকে চীনের পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যতিক্রমধর্মী সম্মান ও উষ্ণ অভ্যর্থনা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা। বেইজিং খুব সচেতনভাবেই এমন পরিবেশ তৈরি করেছে, যাতে ট্রাম্প নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ নেতা হিসেবে অনুভব করেন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভিত্তি নিজেদের শর্তে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে চীন।
ঝোংনানহাই সফরের সুযোগ দেওয়া এই বার্তার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। চীনের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই কম্পাউন্ড সাধারণত বিদেশি নেতাদের জন্য উন্মুক্ত নয়। সেখানে ট্রাম্পকে আমন্ত্রণ জানানো ছিল অত্যন্ত প্রতীকী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে শি জিনপিং বোঝাতে চেয়েছেন যে ট্রাম্পকে তিনি একজন সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং এমন একজন নেতা হিসেবে দেখছেন, যার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভবিষ্যতের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শি জিনপিং বহুদিন ধরেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতি ব্যবহার করে আসছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়া কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধকেও। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই কৌশল নিয়েছে চীন। কারণ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধরন অনেকটাই ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সম্মান ও প্রতীকী আচরণের ওপর নির্ভরশীল। বেইজিং মনে করছে, ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সম্মান দেখানো হলে ভবিষ্যতে চীনের প্রতি তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিতে পারেন তিনি।
এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং শুল্কসংক্রান্ত উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্ককে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। চীনের অর্থনীতি বর্তমানে ধীরগতির চাপ মোকাবিলা করছে—রিয়েল এস্টেট সংকট, দুর্বল ভোক্তা আস্থা এবং বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বেইজিং নতুন করে সংঘাত বাড়াতে চায় না। বরং তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে অন্তত একটি ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’র পরিবেশ তৈরি করতে আগ্রহী।
এ ছাড়া চীন জানে, ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ট্রাম্প অতীতে মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছিলেন এবং আন্তর্জাতিক জোটের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বেইজিং হয়তো মনে করছে, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি ব্যক্তিগত বোঝাপড়া তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে তাইওয়ান, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্য ইস্যুতে কিছুটা কৌশলগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শি জিনপিং নিজের জনগণকে দেখাতে চান যে বিশ্বরাজনীতিতে চীন এখন এমন অবস্থানে পৌঁছেছে। ট্রাম্পকে দেওয়া বিশেষ সম্মান তাই আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার প্রদর্শনও।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পকে দেওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা ছিল বহুমাত্রিক কৌশলের অংশ। এতে ব্যক্তিগত কূটনীতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভূ-রাজনৈতিক হিসাব এবং প্রতীকী শক্তি—সবকিছুর সমন্বয় রয়েছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য পরিষ্কার- প্রতিযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং এমন একটি সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং চীন রক্ষা করতে পারবে নিজের কৌশলগত স্বার্থ।




